হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে একের পর এক আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে সরকারি নিরীক্ষায়। চুক্তির বাইরে শত শত কোটি টাকা পরিশোধ, অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত বিল, সময়মতো কাজ শেষ না হলেও ঠিকাদারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় না করাসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৪ হাজার ৪৬৯ কোটি ৯ লাখ ৩১ হাজার ৭৬৬ টাকার আর্থিক ক্ষতির হিসাব করেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) দপ্তর।
২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প। এর মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের। বাকি তহবিলের জোগানদাতা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে কাজ করছে এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।
৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার এলাকার তৃতীয় টার্মিনালের ফ্লোর স্পেস ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। সেখানে রয়েছে ১৭৭টি চেকইন কাউন্টার, ৬৪টি বহির্গমন ইমিগ্রেশন ডেস্ক এবং ৬৪টি আগমন ইমিগ্রেশন ডেস্ক।
সিএজি কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন, অনুমোদনবিহীন ব্যয় এবং ঠিকাদারকে অযৌক্তিক আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২৭টি খাতে অনিয়ম–দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয়-সংক্রান্ত অভিযোগ সরকারের নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এসব বিগত সরকারের আমলে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রকল্প-সংক্রান্ত অভিযোগ।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয়-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিবেদন সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়াই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ব্যয়
সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই কনসালট্যান্ট কর্তৃক ভেরিয়েশন অনুমোদনের মাধ্যমে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এতে অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৮৯ কোটি ১৯ লাখ ৭১ হাজার ১২১ টাকা। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসরণ করা হয়নি এবং অনুমোদনের সীমাও অতিক্রম করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির বাইরে গিয়ে এবং প্রস্তাবিত ওজনের চেয়ে বেশি হিসাব দেখিয়ে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের ১২২ কোটি ৭১ লাখ ৬ হাজার ৪১২ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সিরামিক ডাক্টের পরিবর্তে কংক্রিট ডাক্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় চুক্তিমূল্য বেড়ে যায়। কিন্তু এরপরও কোনো প্রকৃত সাশ্রয় না হলেও কাল্পনিক সাশ্রয় দেখিয়ে ‘ভ্যালু ইঞ্জিনিয়ারিং’ খাতে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ খাতে সরকারের ৭০ কোটি ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকার মাটি অপসারণের কাজেও বড় ধরনের অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। চুক্তি অনুযায়ী, মাটি সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরে নিয়ে ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। তবে এর বিল করা হয়েছে সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরে মাটি পরিবহনের হিসাব ধরে। এ খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮৩ কোটি টাকা।
চুক্তির বাইরে ব্যয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে প্রকল্পের পরামর্শকদের জন্য অতিরিক্ত ৭১ লাখ ৫২ হাজার ৩০০ টাকা বিমানভাড়ার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। চুক্তির বাইরে পরামর্শকদের গাড়িভাড়ার অর্থ ঠিকাদার ও পরামর্শক—উভয় প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের ১১ কোটি ৬০ লাখ ৮৪ হাজার ৬৬০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
নিয়মিত পরামর্শকদের বাইরে এমন কিছু পরামর্শকের বিপরীতেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যাঁদের নাম চুক্তিপত্রে ছিল না। এসব পরামর্শকের সম্মানী বাবদ প্রকল্পের ৩৯ কোটি ৮ লাখ ৯২ হাজার ৮৫২ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। প্রকল্পে বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী দেশ, ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠানের নাম চুক্তিতে নির্ধারিত ছিল। কিন্তু চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ইতালি, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও কোরিয়ার পরিবর্তে চীন ও ভারত থেকে পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এ ছাড়া তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের বেজমেন্ট ফ্লোর ও ওয়াটারপ্রুফিং নির্মাণকাজে চুক্তিবহির্ভূতভাবে ১ কোটি ২৬ লাখ ২৯ হাজার ১৬৮ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারি অর্থের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
