বুমার ভার্সেস জেন জি ও জেন আলফা

আনোয়ার হাকিম: বিশ্বজুড়ে জেনজিদের উত্থানে বেবি বুমার প্রজন্মের কথাও আজকাল সমস্বরে উচ্চারিত হচ্ছে। কারা এই জেন জি আর কারাই বা এই বুমার প্রজন্ম তা নিয়ে এতদিনে কারো মধ্যে কোনো ধোয়াশা থাকার কথা না। মূলত চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাটের দশকে যাদের জন্ম তারা বুমার আর যাদের জন্ম ১৯৯৬ সালের পরে তারাই জেনজি প্রজন্ম নামে পরিচিত।

এক জেনজিদের সামলাতে না সামলাতেই আরেক জেন আলফারা ইতোমধ্যেই গায়ে-গতরে, শিক্ষায়-দীক্ষায়, মননে-মেজাজে বড় হয়ে উঠেছে। কথায় আছে আগের হাল যে দিকে যায় পেছনের হালও সেদিকে যায়। কথাটা আমাদের সবারই মাথায় রাখা উচিত। বিশ্বব্যাপী জেনজিদের উত্থান, বিশেষত আমাদের উপমহাদেশে এদের সাফল্য, রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের নতুন করে ভাবাতে শুরু করেছে। যারা রাষ্ট্র ক্ষমতার বিভিন্ন সেক্টর পরিচালনা করছেন, যারা রাজনীতির কথা বলে জনগণের প্রতিভূ হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করে আসছেন এতদিন, তারাও নিশ্চয় আজ স্বস্তিতে নেই।

এখনই সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গী পরিহার করে বাস্তবতার নিরীখে সমাজে, রাষ্ট্রে বিরাজিত সুদীর্ঘকালের ব্যবস্থাপনাকে যদি সংষ্কার করতে ব্রতী না হোন তাহলে জেন জি ও জেন আলফার সমন্বিত শক্তির কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া ভিন্ন কোন পথ থাকবে না।

স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর অতিক্রান্ত হলেও আমরা হিংসা-দ্বেষ ছড়ানো ভিন্ন ঐক্যের ধারে কাছেও যেতে পারি নি। বলা যায়, যেতে চাই নি। ব্রিটিশ আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়ে গেছে, ভালো আর মন্দ। আমরা ভালোগুলোকে নেই নি, বেছে নিয়েছি মন্দগুলোকে। ব্রিটিশের মূল কাজ ছিলো : বিভক্তি ও শাসন। এর মূল হাতিয়ার ছিলো সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা, জাতপাতের ফারাক বজায় রাখা আর শ্রেণীবিভক্ত সমাজ কাঠামো চালু রাখা।

আমরা এগুলোকেই পরম অস্ত্র হিসেবে লুফে নিয়েছি। শুধু লুফে নিয়েই থেমে থাকি নি এগুলোকে পেলে পুষে মহীরুহ করেছি। কথায় আছে ফ্রাংকেনস্টাইনও একদিন তার নিজের সৃষ্টির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলো। আমরা এর প্রমান কড়ায় গণ্ডায় একাধিকবার পেলেও তা থেকে শিক্ষা নেই নি। যুগে যুগে মানুষের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ইতিহাস লেখা হয়েছে। কিন্তু তা থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে বরাবরই অনাগ্রহী থেকেছি। এ বিষয়ে আমাদের সমাজপতি ও রাজনীতিবিদগণের মধ্যে এক ধরনের উন্নাসিকতা পরিলক্ষিত হয়। এ থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বুমার প্রজন্ম নিয়ে আত্মসমালোচনা কেউই করে না। ভাবটা এমন যে, বাপ- দাদার আমল থেকে এভাবেই চলে আসছে, চলুক না সেভাবেই। বাপ- দাদার আমল আর বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের হালহকিকতের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক এটা উপলব্ধিতে করতে না পারলে আমাদের কপালে খারাবি আছে।

উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদেরকে ধাক্কা দিয়ে গেলেও আমরা আবারো পুরোনো স্টাইলে গা ঝাড়া দিয়ে আগেকার অবস্থানে ফিরে যাচ্ছি। যেন পথ চলাতে একটু ‘উস্টা’ খাওয়া তো স্বাভাবিকই। কিন্তু অভিধানে আলতো চালের বাংলা ‘উস্টা’ শব্দের সাথে ভয়ানক আরেকটি ইংরেজি শব্দ ‘আউটস্টেড’ও যে আছে তা খেয়াল করছি না। ৩৬ শে জুলাই ২০২৪ কি নিছক ‘উস্টা’ ছিলো? নাকি ‘আউটস্টেড’ এর প্রমাণক ছিলো?

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখিনি। আমাদের নিজেদের চাক্ষুষ করা বিপর্যস্ত অবস্থা থেকেও শিখছি না। এমনকি ছোট দেশ নেপালের জেনজিদের উত্থানকেও এখন আর সেভাবে আমলে নিচ্ছি না। চরম বিপর্যস্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মুখে পতিত হয়েও তারা আবার গুছিয়ে নিয়েছে, অন্য অর্থে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

আমরা জুলাই বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি সামাল দিতে পারি নি আমাদের রাজনৈতিক শক্তি সমূহের বিপরীতমুখী অনড় অবস্থান ও প্রতিপক্ষকে নিশ্চিন্ন করে দেওয়ার ভূমিকার কারণে। বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যারা ছিলেন কর্তৃত্বের অধিকারী তারা অনভিজ্ঞ, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, মানসিক দৃঢ়তায় কমজোরি আর আন্তরিকতায় খাদ যুক্ত। যার ফলে বিপ্লব বেহাত হতে সময় নেয় নি। যার অনিবার্য পরিণতি হলো আজকের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। অর্থনীতির কথা নাই বা বললাম।

বুমার প্রজন্ম অনেকটাই কর্তৃত্ববাদী, সনাতনী ও প্রযুক্তিবিযুক্ত। প্রায় সব কিছুতেই তারা সিণ্ডিকেটিজমে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকে। কোটারী স্বার্থ ভিন্ন অন্য কিছু চিন্তার মধ্যেও নিতে পারে না। পক্ষান্তরে জেনজি আর জেন আলফা স্বাধীনচেতা, প্রযুক্তিনির্ভর, উদার দৃষ্টিভঙ্গির ও ইনসাফ প্রত্যাশী। এরা ভাষা উৎক্ষেপনে শ্লীল- অশ্লীলের ধার ধারে না, এদের আওয়াজ কর্কশ, মেজাজ সপ্তমে, আচার-আচরণে বেপোরোয়া।

এরা কর্মোদ্যোগী, স্বপ্নচারী আর ঐক্যে ইস্পাত দৃঢ়। এদেরকে বেয়াদব, অপরিণামদর্শী, উশৃংখল বলা যেতে পারে, কিন্তু তারা এতে ভ্রুক্ষেপ করে না। কারণ তারা ভালো করেই জানে তাদের অভিভাবকগণই তাদেরকে সেভাবে পেলে পুষে বড় করেছেন কিংবা তাদের প্রতি যথাযথ নজর দেন নি। তাই এদের কল সাইন, ফ্রিকোয়েন্সী, আন্ডারস্ট্যান্ডিং লেভেল আমাদের চেয়ে আলাদা। যার ফলে টিউনিংয়ে সমস্যা হচ্ছে। এর অবশ্যই কার্যকর একটা সমন্বয় প্রয়োজন।

তারুণ্যের জয়জয়কার পৃথিবীব্যাপী। প্রযুক্তি ও তথ্যের সুবিধা তাদের হাতের মুঠোয়। তাই সমাজে বিরাজিত অসঙ্গতি ও বৈষম্য তাদের কাছে সহজেই সমাধানযোগ্য বিষয় বলে মনে হচ্ছে। তারা কার্যোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চায়, চাকরি বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার প্রত্যাশা করে, সমাজব্যবস্থাপনায় শুদ্ধতা চায়, বিচার ব্যবস্থায় ইনসাফ নিশ্চিত করতে চায়। মোটকথা, উন্নত ও স্বপ্নমুখী পরিবেশ কামনা করে।

পঞ্চান্ন বছরে আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অনেক নিরীক্ষা হয়েছে, কোনোটাই কাজ করে নি। উপরন্তু সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারীদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকট হয়েছে, দুর্নীতি ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ঘন ঘন নিরীক্ষা, সিলেবাসের যথেচ্ছ ব্যবচ্ছেদ, শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতা তাদেরকে ক্ষুব্ধ করেছে। দীপু মনির রান্নাবান্না নির্ভর হালকা চালের শিক্ষা পাঠ, কনডেন্সড সিলেবাস, অটো পাস, জিপিএ-তে এ প্লাসের ছড়াছড়ি এবং সর্বোপরি শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়ে রাজনীতির দাপট ইত্যাদিতে শিক্ষার্থীরা কার্যত বই থেকে বিযুক্ত হয়ে সহজ পদ্ধতির শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

এর অন্যথা হলেই তাদের অসন্তোষের মাত্রা বিক্ষোভে বিস্ফারিত হয়ে পড়ছে। এর উপর রয়েছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, বিচারহীনতা ও বাছবিচারের যথেচ্ছাচার, অফিস আদালতে সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি। সব মিলিয়ে তরুন প্রজন্ম একটা স্বচ্ছ ও উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা কামনা করে যেমনটি তারা নেট ঘেটে প্রতিনিয়ত বহির্বিশ্বে প্রত্যক্ষ করছে। পক্ষান্তরে যারা বয়ষ্ক তাদের মাথায় এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, ছাত্ররা কেন এতসব নিয়ে মাথা ঘামাবে? এখানেই নীতিনির্ধারকদের সাথে তাদের ফারাক ক্রমশ ব্যাপকতর হচ্ছে।

সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা হুট করে বদলে দেওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন লাগাতার সংষ্কার ও লাগসই বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা। এখন আর দলীয় পেটোয়া বাহিনী দিয়ে কদর্য কর্মকে দাবিয়ে রাখা যায় না। আখেরে তা ‘উস্টা’থেকে ‘আউটস্টেড’ এর সমার্থক হয়ে পড়ে।

অতি সম্প্রতি ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির আকস্মিক অভ্যুদয় জেনজি প্রজন্মের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দামকে মহামূল্যবান করে তুলেছে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির প্রতিকার প্রার্থীর আবেদনকে তুচ্ছভরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া ও তাদেরকে বাসাবাড়ীতে জ্বালাতন সৃষ্টিকারী ককরোচের সাথে তুলনা করাকে নিয়ে ভারত জুড়ে রাতারাতি তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। জেনজি আন্দোলনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সবসময়ই দ্রুত সংক্রমণশীল।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় যখনই যে দল বা গোষ্ঠী থাকে না কেন এই ঢেউয়ের মুখোমুখি তাদেরকে বারংবার হতে হবে তাদেরই অবিমৃষ্যকারিতার কারণে। জেন আলফাকে জেনজিদের সাথে কাতারবন্দী হতে দেওয়ার আগেই এখনো সময় আছে দৃশ্যমান কিছু করার। তাই, পুরোনো সমাজ কাঠামো, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় যুগোপযোগী মেরামত কাজ শুরু করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। অতএব, সাধু সাবধান। সবার সুবোধ জাগ্রত হোক। #

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *