৩৪৫৩ কেজি মাংস উদ্ধার: সুন্দরবনে থামছে না হরিণ শিকার

সুন্দরবনে হরিণ শিকার ও পাচারচক্রের দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই যেন কমছে না। বর্তমানে বনে সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও থেমে নেই বেপরোয়া চোরা শিকারিদের হরিণ নিধন। সবশেষ চলতি বছরের ২০ জুলাই সুন্দরবনের নলিয়ান এলাকা থেকে ৩০ কেজি হরিণের মাংসসহ মেহেদী হাসান (৩০) নামে এক মাংস ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। তিনি খুলনার দাকোপ থানার বাসিন্দা।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওইদিন দুপুর ২টায় খুলনার দাকোপ থানাধীন নলিয়ান ক্লোজারপাড়া-সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে কোস্ট গার্ড। অভিযানে ৩০ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয় এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ওই মাংস ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়।
সুন্দরবনের অধিকাংশ অঞ্চলে কমবেশি হরিণ দেখা যায়। সাধারণত বনের কটকা, করমজল, দুবলারচর, হিরণ পয়েন্ট, কচিখালী, সুপতি ও ঢাংমারী এলাকায় হরিণের বেশি বিচরণ। সকাল-বিকেলে এসব ঘাসবনে দলবেঁধে হরিণের দেখা মেলে।

 

হরিণ শিকারবিরোধী অভিযানের চিত্র

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন বিভাগের নিয়মিত টহল এবং বনে জলদস্যু কমার পাশাপাশি রাসমেলা বন্ধের পরও কোনোভাবেই কমছে না হরিণ শিকার। বন বিভাগের তথ্য বলছে, সুন্দরবন দেখভালের জন্য বন অধিদপ্তরের দুটি বিভাগ রয়েছে। একটি খুলনা ও সাতক্ষীরা নিয়ে (সুন্দরবন পশ্চিম), অন্যটি খুলনার অংশ ও বাগেরহাট নিয়ে (সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ)। গত ৩ বছরে এই দুই বিভাগ ৩৪৫৩ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করেছে। এ কাজে জড়িত ২৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন বিভাগ ছাড়াও কোস্ট গার্ড, র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন সময় হরিণের মাংসসহ শিকারি আটক হয়েছেন।

তিন বছরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের হরিণ শিকারবিরোধী অভিযানের চিত্র তুলে ধরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হরিণের মাংস উদ্ধার ৩৯৫ কেজি, হরিণ ধরার ফাঁদ উদ্ধার ৪ হাজার ৮৬০ ফুট, মামলা ২৭টি, আসামি ৫৫ জন, যার মধ্যে গ্রেপ্তার ৪৪ জন।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে হরিণের মাংস উদ্ধার ৭৯৩ কেজি, হরিণ ধরার ফাঁদ উদ্ধার ২৪ হাজার ৬৪৮ ফুট, মামলা ৩৭টি, আসামি ৭২ জন, যার মধ্যে গ্রেপ্তার ৩৫ জন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে হরিণের মাংস উদ্ধার ২৪৯ দশমিক ৫ কেজি, হরিণ ধরার ফাঁদ উদ্ধার এক লাখ ২০ হাজার ৮৮৩ ফুট, মামলা ৩৫টি, আসামি ৮১ জন, এর মধ্যে গ্রেপ্তার ৭৪ জন।

সবচেয়ে বেশি হরিণের মাংস উদ্ধার হয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে, ৭৯৩ কেজি। সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারও হয় একই অর্থবছরে, ৭০ জন। তিন বছরে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের হরিণ শিকারবিরোধী অভিযানের চিত্র তুলে ধরে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে ৫১৪ কেজি, হরিণ ধরার বিবিধ ফাঁদ উদ্ধার—এক হাজার মিটার, এক হাজার ৩২৪টি, সাত বান্ডিল; মামলা ৩৮টি, আসামি ৯৫ জন, এর মধ্যে গ্রেপ্তার ২০ জন; চামড়া আটটি, মাথা চারটি, পা ১৬টি এবং মৃত হরিণ উদ্ধার একটি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে হরিণের মাংস উদ্ধার ৯৩১ দশমিক ৭ কেজি, হরিণ ধরার বিবিধ ফাঁদ উদ্ধার—২০০ মিটার, ৪৬৪টি ও ১০০ হাত; মামলা ৫০টি, আসামি ১১২ জন, এর মধ্যে গ্রেপ্তার ১২ জন। এছাড়াও হরিণের চামড়া পাঁচটি, মাথা চারটি এবং মৃত তিনটি হরিণ উদ্ধার করা হয়।২০২৫-২৬ অর্থবছরে হরিণের মাংস উদ্ধার ৫৭১ কেজি, হরিণ ধরার বিবিধ ফাঁদ উদ্ধার ৫৯০ মিটার; মামলা ৩১টি, আসামি ৪১ জন, এর মধ্যে গ্রেপ্তার ২১ জন। এ ছাড়াও হরিণের চামড়া একটি, মাথা পাঁচটি, পা আটটি এবং মৃত একটি হরিণ উদ্ধার করা হয়।সবচেয়ে বেশি হরিণের মাংস উদ্ধার হয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৩১ দশমিক সাত কেজি। সবচেয়ে বেশি ফাঁদ উদ্ধার হয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে—১০০ মিটার, ৫৪৩টি, ১১০০ ফুট ও ১০০ হাত। সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার এই অর্থবছরে ২১ জন।

সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে। এর আগে ২০০৪ সালে হরিণের সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার। সেই হিসাবে ২১ বছরের ব্যবধানে সুন্দরবনে হরিণ বেড়েছে ৫৩ হাজার ৬০৪টি।

যেভাবে ফাঁদ পেতে হরিণ ধরেন শিকারিরা

হরিণ শিকারের বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। তারা বনের মধ্যে ফাঁদ পেতে ও গুলি করে চিত্রা ও মায়া হরিণ শিকার করেন। পরে সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মাংস, মাথা ও শিং বিক্রি করেন। এভাবে হরিণ শিকার করে বিক্রি করতে গিয়ে অনেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেও ধরা পড়েন।বন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরবনে হরিণ শিকারের জন্য মালা ফাঁদ, ছিটকা ফাঁদ, হাঁটা ফাঁদ ও গলা ফাঁদ ব্যবহার করেন শিকারিরা।সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোর একাধিক সংঘবদ্ধ চোরাশিকারি বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সুন্দরবনে ঢুকে পড়েন। পেশাদার এসব শিকারি গোপনে নিয়মিত হরিণের যাতায়াতের পথে ফাঁদ পেতে রাখেন। চলাচলের সময় হরিণগুলো সেই ফাঁদে আটকে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বৈধ বা অবৈধভাবে বনে ঢুকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে হরিণ শিকার করেন শিকারিরা। বন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পেশাদার হরিণ শিকারিদের বিশেষ সিন্ডিকেট রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে থাকে এজেন্ট ব্যবসায়ীরা। এসব এজেন্টের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো মাংস এনে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হয়। কোস্ট গার্ডসহ বন বিভাগের অভিযানে মাঝেমধ্যে কিছু মাংস ধরা পড়লেও অধিকাংশ শিকারি থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তার কারণে সুন্দরবনে হরিণ শিকার কমছে না।

এম কে এ ২৬ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *