উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ এখনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—এমন একটি পুরোনো আবেগ সমাজে প্রচলিত থাকলেও, বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো ভবিষ্যৎমুখী বা আগামীর শিক্ষায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। বিপরীতে, একসময়ের ‘বিবিএ-নির্ভর’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুগের হাওয়া বুঝে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গত এক দশকের (২০১৪-২০২৩) তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি রূঢ় বাস্তবতা সামনে আসে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমশ ‘মানবিক শাখা’ আর ‘সরকারি চাকরির প্রস্তুতি’র বিশাল কারখানায় পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাজারের চাহিদা বুঝে বেসরকারি খাত বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগ্রহের কেন্দ্রে ‘সরকারি চাকরি’
২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ১৮টি নতুন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মোট শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ। অথচ এই বিপুল সম্প্রসারণের সুফল বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল বা গণিত (STEM) বিভাগগুলো পায়নি; উল্টো এসব বিভাগে শিক্ষার্থীর অনুপাত কমেছে।
২০১৪ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও কারিগরি শাখায় শিক্ষার্থী ছিল ১১.৬০ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯.৯ শতাংশে। বিপরীতে, মানবিকে শিক্ষার্থী ৩৩.৬২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১.৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
কেন এই পশ্চাদপসরণ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, বিজ্ঞান বিভাগে ল্যাব ও ব্যবহারিক কাজের জন্য যে পরিমাণ হাড়ভাঙা খাটুনি প্রয়োজন, তার তুলনায় বিষয়ভিত্তিক চাকরির বাজার অত্যন্ত সীমিত। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের বদলে সহজ কোনো বিষয়ে ভর্তি হয়ে ‘বিসিএস’ বা সাধারণ সরকারি চাকরির প্রস্তুতির দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুরা তাদের পছন্দের বিষয় পড়ার সুযোগ খুব কমই পান। ভর্তি পরীক্ষার র্যাঙ্কিংয়ের যাঁতাকলে পড়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে এমন বিষয়ে ভর্তি হন, যার সঙ্গে বিজ্ঞান বা তাদের নিজস্ব আগ্রহের কোনো সম্পর্ক নেই।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের ভাষায়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু ‘বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে’ পরিচালিত হয় না, তাই তারা মানবিক ও সমাজ গঠনে বেশি জোর দেয়। তবে এই যুক্তির আড়ালে একটি নির্মম সত্য হলো—কর্মমুখী শিক্ষার বাজার ধরতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে অনেকটাই ব্যর্থ।
‘বিবিএ মডেল’ থেকে ‘এআই’ যুগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
এক দশক আগেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ছিল ‘বিবিএ’ পড়ার হিড়িক। কিন্তু বাজার যখন বদলেছে, বেসরকারি খাতও নিজেদের খোলস পাল্টেছে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ভর্তির হার ৩৪.২৫ শতাংশ থেকে একলাফে প্রায় ৫৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
একই সময়ে ব্যবসায় শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩৮.৯৬ শতাংশ থেকে কমে ২২.৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনুধাবন করতে পেরেছে যে, ভবিষ্যতের বাজার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তির। শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি দিয়ে যখন পড়ছে, তখন তারা এমন বিষয়ই বেছে নিচ্ছে যা তাদের একটি নিশ্চিত ক্যারিয়ার দিতে পারে।
বিজ্ঞান চর্চার জন্য ল্যাব ও মানসম্মত শিক্ষক অপরিহার্য। ইউজিসির তথ্য বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু বিভাগ খুলেই বসে নেই, তারা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।
গত এক দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত সাড়ে তিন হাজার পূর্ণকালীন শিক্ষক এবং প্রায় এক হাজার পিএইচডিধারী শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন। ২০২৩ সাল নাগাদ তাদের মোট শিক্ষকের সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৮৯, যার মধ্যে প্রায় ১৩ হাজারই পূর্ণকালীন।

গত এক দশকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:১৯ থেকে ১:১৮ হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও খুব একটা পিছিয়ে নেই, তাদের অনুপাত ১:২৩ থেকে উন্নত হয়ে ১:২১-এ দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি-এর পরিচালক অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান যথার্থ-ই বলেছেন, একটি দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় যত বেশি জোর দেবে, জাতীয় উন্নয়নে তার অবদান তত বেশি হবে। এক্ষেত্রে ইউজিসি এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে কেবল দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে কঠোর হতে হবে।
বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্থান ও নারী শিক্ষায় পুরোনো স্থবিরতা
শিক্ষার্থীদের আগ্রহের জগতেও কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যেখানে মূলত কলা ও সমাজবিজ্ঞানের আধিক্য) প্রতি আগ্রহ কমছে। ২০১৪ সালে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়লেও ২০২৩ সালে তা কমে ৬১.১৪ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে কৃষি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি নির্ভর বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর হার বেড়ে ৩৮.৮৬ শতাংশ হয়েছে।
তবে এতসব ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও একটি জায়গায় সমাজ এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছে—তা হলো বেসরকারি খাতে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর হার যেখানে ৩৯ শতাংশ (জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ধরলে ৪৭%), সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই হার মাত্র ৩৪ শতাংশ (এক দশক আগে ছিল ২৬ শতাংশ)।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন এর পেছনের রূঢ় সত্যটি তুলে ধরেছেন। পরিবারের যদি শুধু একজনকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল খরচ করে পড়ানোর সামর্থ্য থাকে, তবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ আজও মেয়ের চেয়ে ছেলের পেছনেই সেই বিনিয়োগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
পরিসংখ্যান স্পষ্ট—সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি শুধু সস্তা টিউশন ফি, আবাসন আর সরকারি চাকরির কোচিং সেন্টার হিসেবে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি-নির্ভর চাকরির বাজারে নেতৃত্ব দেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই। বিজ্ঞান ও গবেষণায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এই উদাসীনতা শুধু শিক্ষা খাতের জন্যেই নয়, দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়নের জন্য-ও একটি অশনিসংকেত।
জনপ্রশাসন/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৮ জুলাই ২০২৬
