কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) যখন প্রথম বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়, তখনই প্রশ্ন উঠেছিল—মানুষের কাজের জায়গায় কি ভাগ বসাবে এই প্রযুক্তি? ২০২৬ সালে এসে সেই আশঙ্কা যেন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং রূপ নিচ্ছে কঠিন বাস্তবে। বিশ্বজুড়ে মেগা টেক জায়ান্টগুলো তাদের পুনর্গঠন ও কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে অন্যতম মূল নিয়ামক হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে এআইয়ের নাম।
সম্প্রতি তেল আবিবভিত্তিক ওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম মানডে ডটকম (monday.com) তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০০ জন কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা এরান জিনম্যান স্পষ্ট করেছেন যে, এটি সাধারণ অর্থ সাশ্রয়ের কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো এআই-চালিত প্রবৃদ্ধির দিকে প্রতিষ্ঠানকে জোরকদমে এগিয়ে নেওয়া। তবে মানডে ডটকম একা নয়—সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে গোটা প্রযুক্তি বিশ্ব আজ একই স্রোতে ভাসছে।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কেবল মার্কিন প্রযুক্তি খাত থেকেই প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।
শীর্ষ চার প্রতিষ্ঠান: আমাজন, ওরাকল, মেটা এবং মাইক্রোসফট—এই চার টেক জায়ান্ট মিলেই ছাঁটাই করেছে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী।
বিনিয়োগের নতুন দিক: কর্মীদের বেতন থেকে বেঁচে যাওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার এখন ঢালা হচ্ছে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নে।
কাজের গতি ও পরিধি: গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে সফটওয়্যার কোডিং—কাজে গতি আনতে বড় ভূমিকা রাখছে এআই এজেন্টরা। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের দাবি, এআই ব্যবহারের ফলে ছোট দল দিয়েই এখন কয়েক সপ্তাহের কাজ কয়েক দিনে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে, যার ফলে মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত পদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসছে।
গুগল, সেলসফোর্স, পেপ্যাল, সিসকো কিংবা ব্লক—ছাঁটাইয়ের এই তাণ্ডব সর্বত্রই বিদ্যমান।
শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীদের অম্ল-মধুর প্রতিক্রিয়া
মজার বিষয় হলো, ছাঁটাইয়ের অজুহাত হিসেবে এআইকে দাঁড় করানোর এই কৌশল শেয়ারবাজারে সব সময় ইতিবাচক সাড়া ফেলছে না।
তথ্য বলছে, যেসকল কোম্পানি কর্মী ছাঁটাইয়ের মূল কারণ হিসেবে এআইকে দেখিয়েছে, ঘোষণার পরবর্তী ৩০ দিনে শেয়ারবাজারে তাদের পারফরম্যান্স গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়েছে। বাজারের এই প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে—কেবল প্রযুক্তিগত রূপান্তরের দোহাই দিয়ে ঢালাও ছাঁটাইয়ের কৌশলকে বিনিয়োগকারীরা অন্ধভাবে স্বাগত জানাচ্ছেন না।
হতাশার মাঝেও নতুন সম্ভাবনা:
তবে কর্মসংস্থানের পুরো চিত্রটি কেবলই হতাশার—তা কিন্তু নয়। একদিকে যেমন প্রথাগত পদগুলো বিলুপ্ত হচ্ছে, অন্যদিকে জন্ম নিচ্ছে নতুন কাজের ক্ষেত্র।
নতুন নিয়োগের জোয়ার: এনথ্রোপিক কিংবা ওপেনএআই-এর মতো এআই-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল উদ্দীপনায় নতুন কর্মী নিয়োগ করছে।
পদের পুনর্বিন্যাস: মেটা প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করলেও প্রায় ৭ হাজার কর্মীকে এআই-সংক্রান্ত নতুন পদে দায়িত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে আইবিএম তরুণদের জন্য এআই ও হাইব্রিড-ক্লাউডসংক্রান্ত কাজের সুযোগ তিন গুণ বাড়িয়েছে।
অ্যাটলাসিয়ানের সিইও মাইক ক্যানন-ব্রুকসের ভাষায়, বিষয়টিকে সরলভাবে ‘এআই মানুষকে প্রতিস্থাপন করছে’ এভাবে একপক্ষীয় দেখা ঠিক নয়।
আগামীর বার্তা
প্রযুক্তি খাতের এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—এআই হয়তো মানুষকে রাতারাতি পুরোপুরি বেকার করে দিচ্ছে না, তবে কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার সংজ্ঞা একধাক্কায় বদলে দিচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী কাজের পদগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়লেও, যারা এআইকে সঙ্গী করে নিজের দক্ষতাকে নতুন রূপ দিতে পারবেন—আগামীর প্রযুক্তি বিশ্বে তারাই নেতৃত্ব দেবেন।
সূত্র: টেক ক্রাঞ্চ ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস
জনপ্রশাসন/ কেএ /২৮ জুলাই ২০২৬
