মুনাফায় টান, ঋণের চাপ: ব্যাকফুটে গ্রামীণফোন

শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ‘নিরাপদ বাজি’ ও আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। ধারাবাহিক ভালো লভ্যাংশ প্রদান এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তির কারণে বাজারে প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব সবসময়ই ইতিবাচক।

তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা—ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে নিট মুনাফা, লাফিয়ে বাড়ছে ঋণের খাতা, আর তার ওপর ঝুলে আছে বিশাল অঙ্কের আইনি পাওনা সংক্রান্ত বিরোধ।

মুনাফার সূচকে টানা পতন

গত কয়েক বছর ধরে গ্রামীণফোনের মুনাফায় স্পষ্ট মন্দাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ৩,৭০০ কোটি টাকারও বেশি। ২০২৫ সালে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে দাঁড়ায় ২,৯৫৮ কোটি টাকায়। আর
চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে নিট মুনাফা অর্জিত হয়েছে ১,৪২১ কোটি টাকা—যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ কম।

পাঁচ বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ
মুনাফায় মন্দার পাশাপাশি লাফিয়ে বাড়ছে গ্রামীণফোনের ঋণের স্থিতি। ২০২০ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১২৪ কোটি টাকা। গত বছরের শেষে তা সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০ কোটি টাকায় আর চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে আরও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা যুক্ত হয়ে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১,১৯৫ কোটি টাকায়।

উল্লেখ্য, ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

৩. ১২,৬০০ কোটি টাকারও বেশি আইনি জটিলতা
বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুটি বড় অঙ্কের অডিট ও পাওনা সংক্রান্ত আইনি বিরোধ ঝুলছে গ্রামীণফোনের মাথার ওপর। নিরীক্ষা দাবি ঘিরে বিটিআরসির সঙ্গে প্রায় ১২,৫০০ কোটি টাকার বিশাল আইনি বিরোধ রয়েছে। রেলওয়ের সঙ্গে পাওনা হিসেবে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা পরিশোধের জট দেখা দিয়েছে।

জটিলতা স্বীকার করে গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ জানান, অংকটা তো অনেক বড় এবং পুরো প্রসেসটা নিয়েই একটা ডিসপুট রয়েছে। বেশ কিছু হিসাব যেভাবে করা হয়েছে, সেটা নিয়ে আমাদের নিজস্ব একটা পজিশন আছে। আমরা বিশ্বাস করি, বিষয়টিকে স্বচ্ছভাবে দেখা হলে আলোচনার মাধ্যমে একটি বড় সমাধানের সুযোগ রয়েছে। বিটিআরসির সাথে এ বিষয়ে কথা ও আলোচনা চলছে, কারণ এটি সমাধান করা উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত জরুরি।

লভ্যাংশ ধরে রেখে বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষার চেষ্টা

২০০৯ সালে দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর হিসেবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় গ্রামীণফোন। ব্যবসায়িক চাপে থাকা সত্ত্বেও ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারহোল্ডারদের নিয়মিত সর্বোচ্চ ৩৩০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এমনকি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের জন্যও দেওয়া হয়েছে ১০৫ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ।

সমাপ্তি চিত্র: উচ্চ নগদ লভ্যাংশ দিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও, ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি এবং হাজার কোটি টাকার আইনি বকেয়ার অমীমাংসিত পরিস্থিতি গ্রামীণফোনের ভবিষ্যৎ পথচলায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

জনপ্রশাসন/কেএ/ ২ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *