খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র ভাঙতে ‘এক্সিট’ কৌশল

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণের এক গভীর ও জটিল ব্যাধিতে জর্জরিত। তবে এই সংকট এখন আর কেবল ব্যাংকগুলোর ভেতরের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা পুরো অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৫ সাল শেষে দেশে মোট ১৮.২১ লাখ কোটি টাকা বিতরণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা—যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। আর পুনঃতফসিল, অবলোপন ও আইনি জটিলতায় আটকে থাকা ‘সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ’ (Distressed Assets) হিসাব করলে তা দাঁড়ায় প্রায় ১০.৯২ লাখ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।

এই বিপুল পরিমাণ অকার্যকর সম্পদের কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমছে, মূলধনের ওপর চাপ বাড়ছে এবং নতুন বিনিয়োগ ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এই অচল অবস্থা ভাঙতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে এসেছে একটি নতুন মেকানিজম—‘ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি’।

পূর্বে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে পুনঃতফসিল (রি-শিডিউলিং) ব্যবস্থার ওপর ভরসা করা হলেও তা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশেষ নীতিগত সহায়তায় যে ২৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, তার প্রায় ৪০ শতাংশই আবারও খেলাপি হয়ে পড়েছে।

এই চক্র ভাঙতেই আনা হয়েছে ‘ওয়ান-টাইম এক্সিট’ কৌশল। নতুন এই সার্কুলার অনুযায়ী খেলাপি গ্রাহকরা তাদের ঋণের মূল অর্থ (Principal Amount) একবারে পরিশোধ করে ঋণ হিসাব থেকে এককালীন ‘এক্সিট’ নিতে পারবেন। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে আরোপিত ও অনারোপিত উভয় ধরনের সুদই মওকুফ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আগে ‘কস্ট অব ফান্ড’ বা তহবিল খরচ আদায়ের যে আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, তা-ও শিথিল করা হয়েছে। তবে মূলধন কোনোভাবেই মওকুফ করা যাবে না।

কারা পাবেন না: প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ (ফান্ড ডাইভার্সন) বা অন্য অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা এই সুবিধা পাবেন না। এটি কেবল প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ব্যবসায়ীদের জন্য।

সুদ মওকুফের কারণে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে এলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্কুলারে নির্দেশিত মওকুফযোগ্য সুদ মূলত ‘স্থগিত সুদ হিসাবে’ রাখা থাকে। এই অর্থ যেহেতু ব্যাংকগুলো আগে কখনো তাদের মুনাফায় হিসাব করেনি, তাই এটি মওকুফ করলে সরাসরি ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফায় বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

বরং নগদ অর্থ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে অচল সম্পদ সচল হবে, প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ কমবে এবং ব্যাংকের ব্যালান্স শিট আরও পরিচ্ছন্ন হয়ে নতুন ঋণ বিতরণের তারল্য বাড়াবে। শুধু সুযোগ নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার কঠোর আল্টিমেটামও জারি করেছে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশের বেশি, তাদের আগামী ৬ মাসের মধ্যে তা ২০ শতাংশের নিচে এবং ১০-২০ শতাংশের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোকে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর ধরে ঋণ পরিশোধ না করে যদি ছাড় পাওয়া যায়, তবে নিয়মিত ও সৎ ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি আরও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে এবং অনেক গ্রাহক ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করে ছাড় পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে পারেন।

তারা বলছেন, ওয়ান-টাইম এক্সিট ফ্যাসিলিটি কোনো অলৌকিক স্থায়ী সমাধান নয়; এটি একটি সাময়িক পুনরুদ্ধার কৌশল মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতকে টেকসই করতে হলে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনতেই হবে। যেমন- ঋণের ঝুঁকি অনুযায়ী সুদের হার নির্ধারণ। পূর্বাহ্নেই ঋণের ঝুঁকি চিহ্নিতকরণের আন্তর্জাতিক নিয়ম চালু করা। তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ক্রেডিট অ্যাপ্রাইজাল জোরদার করে রাজনৈতিক ও বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা।

খেলাপি ঋণের পাহাড় রাতারাতি অপসারণ সম্ভব নয়। তবে ‘ওয়ান-টাইম এক্সিট’ কৌশল এবং ‘ডিএএমসি’-র মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সুচিন্তিত প্রয়োগ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি দেশের থমকে যাওয়া ব্যাংকিং খাতে নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক গতি ফেরাতে পারে।

জনপ্রশাসন/কেএ/ ০৩ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *