মহাখালীর পুকুর: আবর্জনার ভাগাড় এখন মিলনকেন্দ্র

মৌসুমজুড়ে ঢাকায় অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলেই চিরচেনা রূপ নেয় সড়কগুলো। নিমেষেই রাস্তা যেন রূপ নেয় ছোট খালে, ড্রেন উপচে দেখা দেয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। প্রতিনিয়তের এই দুর্ভোগ যেন শহরবাসীকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—একসময় যে জলাশয়গুলো বৃষ্টির বাড়তি পানি শুষে নিত, ঢাকাবাসী তা কতটা নির্মমভাবে হারিয়েছে।

তবে হতাশার সেই ভিড়ে নতুন এক আশার আলো জ্বেলেছে মহাখালীর ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (আইপিএইচ) প্রাঙ্গণের ৭০ বছরের পুরোনো এক পুকুর। এক সময়ের দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনার ভাগাড়টি স্থানীয়দের ভালোবাসা আর তরুণ নগর নকশাবিদদের জাদুকরী স্পর্শে আজ রূপ নিয়েছে এক আনন্দময় মিলনমেলায়।

ঐতিহ্য ও অবহেলার ইতিহাস

মহাখালীতে আইপিএইচ প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই এলাকাটি ছিল এক বিশাল জলাভূমির অংশ। ১৯৫৩ সালে টিটেনাস ও খাওয়ার স্যালাইনের উপযোগী ‘ডিস্টিল্ড ওয়াটার’ তৈরি এবং অগ্নিনির্বাপণের সুরক্ষার কথা ভেবে ১.২ একরের এই পুকুরটি খনন করা হয়। পরবর্তীতে গুটিবসন্তের টিকার কাজে ব্যবহৃত পশুপালন ও বোয়লার চালনার প্রয়োজনে এর পরিধি আরও বাড়ানো হয়।

তবে সময়ের আবর্তে এবং সঠিক তদারকির অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী পুকুরটি তার সৌন্দর্য হারায়। পাশের মহাখালী বাজার ও সাততলা বস্তিসহ চারপাশের বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয় এটি। কচুরিপানায় ঢেকে গিয়ে দূষিত হয়ে পড়ে পানি, বিলুপ্ত হয় জলজ পরিবেশ। একের পর এক পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হলেও স্থায়িত্বের অভাবে বারবারই এটি ঢাকা পড়ে যেত ময়লার স্তূপে।

তরুণ চোখে নতুন স্বপ্নের বুনন

এই মৃতপ্রায় পুকুরটিকে নতুন প্রাণ দিতে উদ্যোগ নেয় ওয়াটারএইড বাংলাদেশ এবং দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে), সহায়তায় এগিয়ে আসে সুইডেন দূতাবাস। কেবল প্রথাগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং একটি টেকসই মডেল তৈরির লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় এক প্রতিযোগিতা।

প্রায় ৪০টি নকশাকে পেছনে ফেলে এতে বিজয়ী হয় ‘টিম ওয়াটার-ইয়ার্ড’। বুয়েট, এমআইএসটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ তরুণ শিক্ষার্থীর এই দলটি পুকুরটিকে কেন্দ্র করে সাজায় নতুন এক পরিকল্পনা। দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘উঠান’-এর ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা পুকুরটিকে আলাদা কিছু না ভেবে স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করার রূপরেখা তৈরি করেন।

প্রকৃতিভিত্তিক শোধন ও নতুন রূপচিত্র

রাসায়নিকের ব্যবহার এড়িয়ে প্রাকৃতিকভাবে পানির গুণগত মান ফেরাতে তারা তৈরি করেন ‘ফ্লোটিং ট্রিটমেন্ট ওয়েটল্যান্ড’ বা ভাসমান প্রাকৃতিক শোধন ব্যবস্থা। পানিতে রোপণ করা হয় স্পাইডার প্ল্যান্ট, কচু ও কলাবতী গাছের মতো উদ্ভিদ, যা প্রাকৃতিকভাবেই দূষণ শুষে নেয়।

পুরো প্রাঙ্গণকে কয়েকটি উপযোগী অংশে ভাগ করা হয়:

কমিউনিটি ডেক ও ওয়াকওয়ে: মানুষের হাঁটা ও গল্প-আড্ডার জন্য নদীর তীরের আদলে তৈরি বসার স্থান।

পরিবেশবান্ধব সবুজ বলয়: স্থানীয় জাতের বিভিন্ন গাছপালা রোপণ করে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা।

সুরক্ষিত এলাকা: অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে সাঁতার কাটার জায়গায় বিধিনিষেধ রেখে স্থানটি রাখা হয়েছে সবার জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত।

স্থানীয়দের অংশগ্রহণেই মূল সফলতা

ডিজাইন বা নকশা আঁকা সহজ হলেও সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল পুকুরপাড়ে বসবাসকারী মানুষের আস্থা অর্জন করা। শুভ ও তাঁর নকশাবিদ দলটি বুঝেছিলেন—স্থানীয় বাসিন্দাদের দায়িত্ব না দিলে কোনো পরিবর্তনই স্থায়ী হয় না।

তাই ডিএসকে ও ওয়াটারএইড-এর সহায়তায় স্থানীয়দের নিয়ে একাধিক উঠান বৈঠক করা হয়। বসার জায়গা কোথায় হবে, কোন গাছ লাগানো হবে, তা নির্ধারণের স্বাধীনতা দেওয়া হয় বাসিন্দাদেরই। এর ফলে, একসময় যে পুকুরকে সবাই বলত ‘আইপিএইচ-এর সরকারি পুকুর’, সেটি হয়ে ওঠে ‘আমাদের পুকুর’।

নতুন প্রাণের স্পন্দন

বিকেলের সোনাঝুরি রোদ নামলেই পুকুরপাড়ে ভিড় জমে মানুষের। নারী, পুরুষ ও শিশুদের হাসি-আড্ডায় জমে ওঠে মায়াবী সন্ধ্যা। বিদ্যুৎ চলে গেলেও মানুষ কাদা-ময়লার ভয় ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ছুটে আসে এই পুকুরপাড়ে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মহাখালীর এই পুকুরটি কেবল একটি জলাধার সংস্কারের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে—যেকোনো নগরায়ন বা টেকসই পরিবর্তনের মূল শক্তি হলো স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা ও মালিকানাবোধ। স্থানীয়দের হাত ধরে ফিরে আসা এই পুকুরটি এখন পুরো ঢাকার জন্য পরিবেশবান্ধব এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

জনপ্রশাসন/কেএ/ ০৪ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *