গ্রাহক যখন তীব্র গরমে অন্ধকারে বসে হাতপাখার বাতাস খাচ্ছেন; ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ছে কয়েক গুণ বাড়তি বিলের কাগজ। একদিকে জ্বালানি সংকটে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক সব ‘ভুতুড়ে’ বিল।
সেবা না পেয়েও চড়া মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রাজধানীসহ সারা দেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। খাতা-কলমের হিসাব আর বাস্তবতার এই বিস্তর ফারাক নিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর ব্যাখ্যা যতখানি দীর্ঘ, দায় নেওয়ার প্রবণতা ঠিক ততখানিই ক্ষীণ।
বন্ধ বাড়িতেও ঘুরছে মিটার
রাজধানীর আদাবর থেকে শুরু করে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর—সর্বত্রই একই চিত্র। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেট লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল।
রাজধানীর বেইলি রোডে বসবাসকারী শিল্পী, সাংবাদিক ও লেখক আমিরুল মোমেনীন মানিক হঠাৎ কয়েক গুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে বিলের কাগজসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিদ্যুতের অবিশ্বাস্য ভূতুড়ে বিলের বিষয়টি তদন্ত করে সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, ২০১৩ সাল থেকে বেইলি রোডের ওই বাড়িতে বসবাস করছেন। এ সময়ের মধ্যে প্রতি মাসে তাদের বিদ্যুৎ বিল সাধারণত ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও চলতি মাসে বিল এসেছে ৭ হাজার ৮৮৪ টাকা।
পোস্টে আমিরুল মোমেনীন মানিক লেখেন, ‘এটা (এমন বিল) অবিশ্বাস্য জালিয়াতি ছাড়া আর কি! মনে হচ্ছে কোনো সিন্ডিকেটের কারসাজি। অ্যাপার্টমেন্টের আরও কয়েকজন জানালো, তাদেরও এরকম বিল এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ, নিত্যপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। এরকম ভূতুড়ে বিল ভয়াবহ অস্বস্তি তৈরি করেছে সবার মধ্যে । জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
এদিকে, চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক গ্রাহক আগের মাসের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল পাওয়ার অভিযোগ তুলে বিলের কপি ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন।
এ নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বিলের কোনো মিল নেই।
আদাবরের মারুফা আক্তারের মে মাসের বিল ছিল ২ হাজার ৭৭ টাকা, যা জুনে একলাফে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৭০ টাকায়। ডেইলি গুড মর্নিং-এর সম্পাদক এনায়েত হোসেন খানের স্বাভাবিক বিল ৪-৫ হাজার টাকার ঘরে থাকলেও, এবার তাকে গুনতে হয়েছে ১৫ হাজার টাকার বেশি।
প্রিপেইড মিটারের ভেলকি
মোহাম্মদবাগের মাহমুদ মিয়ার মিটারে আগে এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে পুরো মাস চলে যেত। এখন ২০ দিন পেরোনোর আগেই সেই টাকা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটেছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। এক গ্রাহকের পরিবার জুন মাসের প্রথম ১৫ দিন দেশের বাইরে ছিলেন, বাসার অধিকাংশ বৈদ্যুতিক যন্ত্র ছিল বন্ধ। অথচ তার বিল এসেছে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা।
লক্ষীপুরের কমলনগর উপজেলার বাসিন্দা স্থানীয় মুদি দোকানদার আলাউল ইসলাম জানিয়েছে, গত মাসে বিদ্যুৎ বিল এসেছিল ৬৭৭ টাকা। চলতি মাসে এসেছে দুই হাজার ৩৭৭ টাকা। তিনি বলেছেন, শুধু আমার না, বেলাল হোসেনের ৩০০ টাকার জায়গায় এ মাসে এসেছে এক হাজার ৭০০ টাকা।
আদনান শরীফ নামের আরেকজনের এক হাজার ৫০০ টাকার জায়গায় এ মাসে সেখানে এসেছে সাত হাজার ১৯০ টাকা। মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক গ্রাহকের গত মাসে যেখানে এসেছিল ৫০০ টাকা, এ মাসে সেখানে এসেছে এক হাজার ৫০০।
আলাউল ইসলাম বলেন, ‘‘এই বিল নিয়ে আমরা উপজেলা বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের কাছে গিয়েছিলাম।কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথা শোনেই না। এক পর্যায়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।’’
একইভাবে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতি মাসে তার বিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে থাকলেও এ মাসে এসেছে একলাফে তিন হাজার টাকা। একই এলাকার নতুন গ্রাহক সুমনের ক্ষেত্রে প্রথম মাসে বিল ৪০০ টাকা আসলেও দ্বিতীয় মাসেই তা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ টাকায়।
নিমাই সরকার নামে আরেকজনের বাড়িতে দুটো ফ্যান, একটা ফ্রিজ, একটা টিভি আর পানির পাম্প চলে। কখনো ২ হাজার টাকা বিল আসেনি, অথচ এবার সেটাই এসেছে। এভাবে সবার বিলই বেশি এসেছে।
নিমাই বলেন, দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে থাকতে হয়। অথচ মাস শেষে ভৌতিক ও অবিশ্বাস্য সব বিদ্যুৎ বিল! তীব্র গরমে নির্ঘুম রাত কাটানোর পর দ্বিগুণ-তিনগুণ বিলের কাগজ হাতে আসলে কেমন লাগে? তিনি বলেন, এটার সমাধান না হলে সাধারণ মানুষ পথে নামতে পারে।
ভুতুড়ে বিল নিয়ে সরকারের বক্তব্য
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত কয়কদিন আগে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে যান্ত্রিক বা মনুষ্য ত্রুটির কারণে বিলে এই ধরনের ত্রুটি থাকতে পারে। সরকার স্বদিচ্ছার সাথে গুরুত্ব সহকারে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেছেন, ‘আমাদের কাছে যে অভিযোগগুলো এসেছে আমরা সেগুলোর যাচাই করে দেখেছি। আমরা ৭-৮টি অভিযোগ পেয়েছি। সেখানে দেখা গেছে বিল ঠিকই আছে।
ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটা হয়েছে। তারপর আমরা গ্রাহকদের বলছি, নিকটবর্তী যে বিদ্যুৎ অফিস আছে, কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সেখানে অভিযোগ জমা দেন। আমরা সবার অভিযোগ খতিয়ে দেখব। আমরা গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি বিল নেবো না।’
বিরোধী দলের প্রতিবাদ
বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও ভুতুড়ে বিল আসছে এবং সেই বিল নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেছেন, ‘তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। সরকার এসব তদন্ত ও পুনর্যাচাইয়ের কথা বললেও কার্যত দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’
সোমবার (৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘সরকার এখন সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত। মন্ত্রী-এমপি, কখনো প্রধানমন্ত্রী জুলাই সনদ ও সংবিধান নিয়ে বিভ্রান্তিকর কাজ ও পরিকল্পনায় ব্যস্ত, বিরোধী দলকে দমনে নতুন ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যস্ত। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। জনদুর্ভোগের দিকে কোনো নজর নেই।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলেও কার্যকর তদন্ত ও সমাধানের উদ্যোগ দেখা যায়নি। তার মতে, কোনো গ্রাহকের অভিযোগ সত্য কি না, সেটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। কিন্তু স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিইআরসি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্রাহকদের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিইআরসি, ভোক্তা প্রতিনিধি এবং বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করে প্রতিটি অভিযোগ পৃথকভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা উচিত। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত সমস্যার কারণ বেরিয়ে আসবে, অন্যদিকে গ্রাহকদের আস্থাও ফিরবে।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসন্তোষ বাড়তে থাকায় বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য, প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী বিল নির্ধারণ এবং অভিযোগের স্বচ্ছ ও দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা না গেলে গ্রাহক হয়রানি আরও বাড়বে।
জনপ্রশাসন/ কেএ/ ০৬ আগস্ট ২০২৬
