সীমান্তঘেঁষে মানবেতর জীবন, পরিচয়-সংকটে কাঁদছে মানবতা

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন নতুন করে ইতিবাচক ধারায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টায় চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

যশোর, পঞ্চগড় ও পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্তে পরিচয়-সংকটে পড়ে শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) আটকে আছেন বহু মানুষ। তীব্র দাবদাহ ও বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে নারী ও শিশুদের এই মানবেতর জীবনযাপন এক গভীর মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।

শূন্যরেখায় আটকে পড়া মানুষদের হাহাকার
সীমান্তের একাধিক পয়েন্টে আটকে পড়া মানুষদের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত শোচনীয়। বিশেষ করে পঞ্চগড় ও যশোরের বেনাপোল সীমান্তে এই চিত্র সবচেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক:

তৃষ্ণায় কাঁদছে শিশুরা (পঞ্চগড়): সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে ৩৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আটকে আছেন ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। এদের মধ্যে ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী তিনটি শিশু রয়েছে।

প্রবল বর্ষণে খোলা আকাশের নিচে ভিজেছে তারা। বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাবে তৃষ্ণার্ত শিশুরা বৃষ্টির পানি ও ডোবার পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

টানা তিন দিন ধরে আটকা (বেনাপোল): বেনাপোল ও সাদীপুর সীমান্তে নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তার জেরে কয়েকজন ব্যক্তি টানা তিন দিন ধরে শূন্যরেখায় আটকে আছেন। তারা না পারছেন ভারতে ফিরতে, না পারছেন বাংলাদেশে ঢুকতে।

আটকে পড়া এক বাবার আকুতি, “ভাই, আমার বাচ্চার জন্য একটু পানি দেন, টাকা দিচ্ছি,” উপস্থিত সবার বিবেককে নাড়া দিলেও দুই দেশের আইনি জটিলতায় এই মানবিক সংকটের কোনো দ্রুত সমাধান মিলছে না।

রাতের আঁধারে পুশ-ইনের চেষ্টা ও বিজিবির কঠোর অবস্থান
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারতীয় ভূখণ্ডে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত ও উচ্ছেদ কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পর থেকেই সীমান্তে এই চাপ তৈরি হয়েছে।

রোববার (০৭ জুন) সন্ধ্যার পর বেনাপোলের সাদীপুর সীমান্তসংলগ্ন ভারতের হরিদাসপুর এলাকায় কয়েকটি ট্রাকে করে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে জড়ো করা হয়। পরে রাতের আঁধারে সীমান্তের সার্চলাইট নিভিয়ে নারী, শিশুসহ প্রায় ১৫ জনকে শূন্যরেখার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে টহলরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের বাধার মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

এ প্রসঙ্গে বিজিবি’র যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া ও প্রচলিত নিয়ম ছাড়া কাউকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, পঞ্চগড় সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হলেও বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, রাতের টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে।

পরিচয় যাচাই ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় একশ মানুষ বাংলাদেশে ফেরার আশায় জড়ো হচ্ছেন। বিএসএফের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫০ জনের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে।

এর মধ্যে, ৬০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ৯০ জনকে অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে বিজিবির কাছে পাঠানো হচ্ছে। ঢাকা ও দিল্লির সম্মতিতে নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল ধাপে ধাপে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। হোল্ডিং সেন্টারগুলোতেও অনেককে অপেক্ষায় রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক প্রভাব
অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের কঠোর বক্তব্য এবং নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রশ্নে অনড় অবস্থান ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে আটকে থাকা প্রতিটি মানুষ প্রথমত একজন মানবিক সত্তা। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষা করাও সমান জরুরি। রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ও আস্থা বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনীতির নয়; বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার।

স্থানীয়দের দাবি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
সীমান্তে আটকে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং পরিচয় যাচাই করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণেরও দাবি উঠেছে। শার্শা উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আক্তারুজ্জামান লিটু এই সংকটের দ্রুত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।

সার্বিক পরিস্থিতি, সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থানীয় বাস্তবতা পর্যবেক্ষণে বুধবার (৯ জুন) বেনাপোলের সাদীপুর সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর। দ্রুত কোনো কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই সীমান্ত সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জনপ্রশাসন/এফওয়াই/ জেডআরসি/ ‌০৯ জুন ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *