শিশুর মিষ্টি হাসির ছবিই কি ডেকে আনছে বিপদ?

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে শিশুর মিষ্টি হাসির একটি ছবি। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছবি চলে যাচ্ছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। বাবা-মায়ের কাছে এটি নিছক আনন্দের স্মৃতি কিংবা আত্মীয়দের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আবেগ। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার অজানতেই এই সাধারণ ছবিটিই হয়ে উঠতে পারে সাইবার অপরাধীদের হাতের একটি ভয়ংকর অস্ত্র?

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) যেমন আমাদের জীবন সহজ করছে, ঠিক তেমনি তৈরি করেছে এক নতুন ও অন্ধকার অধ্যায়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি এবং ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক সতর্কবার্তা আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

এআই যেভাবে হয়ে উঠছে হাতিয়ার: এতদিন আমরা সাইবার বুলিং বা অনলাইন নিপীড়নের কথা ভেবেছি সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে। কিন্তু এআই-এর কল্যাণে এখন আর অপরাধীর সঙ্গে শিশুর কোনো সরাসরি কথোপকথন বা সম্পর্কের প্রয়োজন হয় না। অপরাধীরা ইন্টারনেট থেকে শিশুর সাধারণ ছবিগুলো সংগ্রহ করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সেগুলোকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃত করে নগ্ন বা অশালীন কনটেন্টে রূপান্তর করছে।

ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালেই এমন বাস্তবের মতো দেখতে ৮ হাজারেরও বেশি বিকৃত ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করা হয়েছে—যা আগের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর অভিজ্ঞতা বলছে, তার সোশ্যাল মিডিয়ার সাধারণ সেলফি ব্যবহার করেই অপরাধীরা তার শোবার ঘরের প্রেক্ষাপটে ভুয়া নগ্ন ছবি তৈরি করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে।

শুধু ব্যক্তি নয়, ঝুঁকিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও: কেবল ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন ক্লাবের ওয়েবসাইট থেকেও অপরাধীরা শিশুদের ছবি সংগ্রহ করছে। স্কুলের ইউনিফর্ম পরা ছবি থেকে সহজেই ওই শিশুর নাম, ঠিকানা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই অপরাধীরা ব্ল্যাকমেলের জাল বুনছে।

অভিভাবকদের যা করা জরুরি: একটি জরুরি গাইডলাইন: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের অনলাইন অভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

ছবি শেয়ারে কঠোর সীমাবদ্ধতা: সন্তানের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় সবার জন্য উন্মুক্ত বা ‘পাবলিক’ করে রাখবেন না। একান্তই শেয়ার করতে চাইলে ‘ক্লোজ ফ্রেন্ডস’ বা শুধুমাত্র পরিচিতদের তালিকা ব্যবহার করুন।

পুরোনো ছবি পর্যালোচনা: গত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা শিশুর সব ছবি চেক করুন। স্কুলের ইউনিফর্ম বা স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় এমন ছবি সরিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি: আপনার সন্তান যে স্কুলে বা ক্লাবে যায়, তাদের ওয়েবসাইটের ফটো গ্যালারি পর্যালোচনা করুন। শিক্ষার্থীদের সহজে শনাক্ত করা যায় এমন ছবি সরিয়ে ফেলতে প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জানান।

আত্মীয়দের সচেতন করা: অনেক সময় আত্মীয় বা বন্ধুরা ভালোবেসে আপনার সন্তানের ছবি শেয়ার করেন। তাদের সঙ্গে এই ঝুঁকি নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন এবং ছবি পোস্ট করার আগে অনুমতি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলুন।

ছবিতে ফিল্টার ও সতর্কতা: শিশুর মুখমণ্ডল বা শরীরের স্পষ্ট ছবি দেওয়ার চেয়ে অস্পষ্ট বা অন্য কোনোভাবে তোলা ছবি ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।

ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড্যান সেক্সটন খুব আক্ষেপের সঙ্গেই বলেছেন, “শিশুর ছবি অনলাইনে না রাখাটাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ।” এই মন্তব্যটি আমাদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা।

প্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনের অংশ, কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমাদের সন্তানের সুরক্ষায় আমাদেরই হতে হবে সবচেয়ে বড় প্রাচীর। প্রতিটি ক্লিক বা পোস্টের আগে মনে রাখুন—আপনার শেয়ার করা সেই ছবিটি যেন অজান্তেই আপনার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

আপনার সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আজই আপনার সোশ্যাল মিডিয়া সেটিংস চেক করুন। সচেতনতাই হোক আমাদের আগামীর রক্ষাকবচ।

জনপ্রশাসন/কেএ/৪ জুলাই২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *