বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও দেশের টেলিকম খাতে থামছে না অবৈধ আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশনের (ভিওআইপি) অপব্যবহার। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় পরিচালিত সাম্প্রতিক অভিযানে ৮ হাজার ৬৮২টি অবৈধ ভিওআইপি সিম শনাক্ত হওয়ার পর দেশের চার শীর্ষ মোবাইল অপারেটরকে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।
প্রতিটি অবৈধ সিমের জন্য ১০ হাজার টাকা হারে প্রশাসনিক জরিমানা করে গত ২১ জুলাই অপারেটরগুলোকে পৃথক নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বিটিআরসির উপপরিচালক শারমিন সুলতানা স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে ১০ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; অন্যথায় টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী পরবর্তী কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি রয়েছে।
জরিমানার খাতা: সবচেয়ে বেশি দায় রবির, কড়া মাশুল বাংলালিংকেরও
বিটিআরসির অভিযানে উদ্ধারকৃত সিমের সংখ্যানুপাতে জরিমানার অঙ্কে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে রবি আজিয়াটা।
রবি আজিয়াটা: ৫,৯৩৫টি অবৈধ সিম শনাক্ত হওয়ায় সর্বোচ্চ ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বাংলালিংক: ১,৮৮২টি সিমের বিপরীতে দিতে হচ্ছে ১ কোটি ৮৮ লাখ ২০ হাজার টাকা।
টেলিটক (রাষ্ট্রায়ত্ত): ৬৮১টি সিমের দায় চেপেছে অপারেটরটির ওপর, জরিমানা ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকা।
গ্রামীণফোন: ১৮৪টি সিমের অপরাধে গুণতে হচ্ছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
যৌথ অভিযান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সহায়তায় বিটিআরসি এই সাঁড়াশি অভিযান চালায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরসির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলে অবৈধ ভিওআইপি চক্রের সন্ধান মেলে। তিনি স্পষ্ট করেন, অবৈধ আন্তর্জাতিক কল রোধে এনটিএমসির সাথে বিটিআরসির এই যৌথ তদারকি নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অব্যাহত থাকবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, টেলিযোগাযোগ আইন এবং লাইসেন্সের স্পষ্ট শর্ত থাকা সত্ত্বেও অপারেটরগুলো তাদের নেটওয়ার্কে অবৈধ কল প্রতিরোধে কার্যকর নিজস্ব মনিটরিং ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
দায় কার: গ্রাহক নাকি নেটওয়ার্ক?
ঘটনায় অপারেটরগুলোর পক্ষ থেকে নিবন্ধিত গ্রাহকদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। জরিমানার মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, গ্রামীণফোন শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে বায়োমেট্রিক যাচাই সম্পন্ন করে সিম বিক্রি করে এবং বিটিআরসির স্ব-নিয়ন্ত্রণ (Self-Regulation) নীতি মেনে চলে।
তার মতে, বায়োমেট্রিক উপায়ে নিবন্ধিত কোনো সংযোগ যদি কোনো গ্রাহক পরবর্তীতে ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন, তবে সেই অপরাধের জন্য সরাসরি সংশ্লিষ্ট গ্রাহককেই আইনের আওতায় আনা বা জবাবদিহি করা উচিত। এ বিষয়ে বিটিআরসির সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান।
মূল সংকটের জের
বিটিআরসির এই ধারাবাহিক জরিমানা এটাই নির্দেশ করে যে, শুধু আইনি কড়াকড়ি বা বায়োমেট্রিক নিবন্ধনই কল বাইপাস পুরোপুরি থামাতে পারছে না। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পরিচালিত এই অবৈধ ভিওআইপি চক্রের গোড়ায় পৌঁছাতে সিমের বায়োমেট্রিক অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি অপরাধীদের সরাসরি শাস্তির আওতায় আনার দাবি তুলছেন টেলিকম বিশ্লেষকরা।
জনপ্রশাসন/ কেএ/ ২৫ জুলাই ২০২৬
