কূটনীতির খেলায় নতুন সংযোগস্থলে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক কূটনীতির খেলায় বাংলাদেশ আজ এক নতুন সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সাম্প্রতিক তিন দিনের ঢাকা সফরকে ঢাকার নতুন প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হলেও, এর আড়ালে রয়েছে ওয়াশিংটনের অত্যন্ত সতর্ক এবং হিসেবি অবস্থান।

মূল বিষয় হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখনই অর্থনৈতিক সহযোগিতা বা বিনিয়োগের হাত বাড়ায়, তখন তার সঙ্গে যুক্ত থাকে কঠোর ভূরাজনৈতিক শর্ত, বাজার উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি এবং দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা।

তারা বলেছেন, সার্জিও গরের সফর বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য একটি কূটনৈতিক বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার স্মারক। তবে জাতীয় অর্থনীতিতে এর সুফল পেতে হলে ঢাকাকে পাড়ি দিতে হবে এক কঠিন পথ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ নিয়ে আসবে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, বাজার উন্মুক্তকরণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কড়া শর্তে।

তারা মনে করেন, আশ্বাস দিয়ে পেট ভরে না। কূটনীতির এই দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ নিজের ঘুঁটিগুলো কতটা বুদ্ধি দিয়ে চালাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলার মারপ্যাচে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ভূরাজনৈতিক মঞ্চ। এই ত্রিভুজ প্রতিযোগিতাকে যদি সুচারুভাবে জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার পক্ষে কাজে লাগানো যায়, তবে এই ভূরাজনীতির কেন্দ্রত্ব-ই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হয়ে উঠবে।

সফরের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং তাৎক্ষণিক অর্জন হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি’ বা ভ্রমণ সতর্কতা লেভেল-৩ থেকে লেভেল-২ তে নামিয়ে আনা। জাতীয় জীবনে এর প্রভাব মূলত মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবসায়িক।

ভ্রমণ সতর্কতা কমানোর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে স্থিতিশীল। এটি বিদেশি ক্রেতা, ব্র্যান্ড এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে, যা দেশের তৈরি পোশাক খাত ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এই মুহূর্তে অক্সিজেনের মতো প্রয়োজন।

পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসনের (এফডিএ) পরীক্ষাগার পুনরায় চালুর আশ্বাস দেশের ওষুধ শিল্পের জন্য একটি বড় সুখবর। তবে আগামী সপ্তাহে ২৫টি মার্কিন কোম্পানির ৪৫ জন কর্মকর্তার সফরের যে কথা বলা হচ্ছে, তা এখনই উদ্‌যাপন করার মতো কিছু নয়। এটি শুধুই ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’; কোনো চূড়ান্ত বিনিয়োগ চুক্তি নয়।

ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ, মার্কিন স্বার্থের নতুন মানচিত্র
সার্জিও গরের এই সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের চশমা দিয়ে দেখলে ভুল হবে। এই সফরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ভূ-রাজনৈতিক বার্তা।

প্রথমত, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রকাল ট্যারিফ’ (এআরটি) বা পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের মনোভাব বুঝতে চেয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাণিজ্যে ভারসাম্য। বাংলাদেশ যদি মার্কিন বাজারে সুবিধা চায়, তবে তাদেরও মার্কিন পণ্যের জন্য দরজা খোলা রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব। বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তি ও খনিজ সম্পদের সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে এটি মার্কিন বলয়ে বাংলাদেশকে যুক্ত করার একটি কৌশলগত চাল হতে পারে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত প্রযুক্তি খাতে চীনের ওপর থেকে বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা কমানোর পথ খুঁজছে।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভারতের উপস্থিতি। সার্জিও গর ঢাকায় এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পরদিন সকালেই ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাথে বৈঠক করেন।

ত্রিবেদীর সাথে বৈঠকটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সরকার বদল হলেও ওয়াশিংটন এখনো ঢাকার রাজনীতি ও স্থিতিশীলতাকে দিল্লির লেন্স থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখছে না। দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় ভারত যে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভরসা, এটি তার একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা।

একই সঙ্গে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিংয়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর’ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এটিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বস্তির; কারণ তারা কোনোভাবেই চায় না বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই ভূখণ্ডে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বলয় ভারী হোক।

বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘সরকার খুব ভালো করে জানে তার ম্যান্ডেট জনগণ দিয়েছে এবং জনগণ খুব তাড়াতাড়ি চাইবে বড় ধরনের ইনভেস্টমেন্ট আসুক। তাদের মাথা ব্যথা হলো এখানে কি স্ট্যাবিলিটি বাড়বে? এখানে কি সংঘর্ষ বাড়বে?

সংঘর্ষ যদি বাড়ে তাহলে তার ইনভেস্টমেন্টে তখন কী হবে।–এই বিষয়টি তারা আরও পরিষ্কার হতে যাচ্ছে। আমার মনে হয় সেই ধরনের আলোচনা না হওয়ার কারণ দেখছি না।’

তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কগুলো আগায় নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতে যাবেন, রাশিয়া যাবেন। সব জায়গা থেকে তার নিমন্ত্রণ আছে এবং সেগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে, হবে। সুতরাং আমাদের চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। ওই চুক্তিতে যাই থাকুক না কেন, সবার সাথে সম্পর্ক হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও যাতে সম্পর্কটা ভালো থাকে সেই চেষ্টাই সরকার করবে।

জনপ্রশাসন/কেএ/ ০৪ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *