ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বহাল তবিয়তে মাদক ও জুয়ার আখড়া >> ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রতিটি উপজেলায় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে নিয়মিত সভা-সমাবেশ চলছে। যুবসমাজকে রক্ষার শপথ নিয়ে কাজ করছে সচেতন মহলও। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—একদিকে যখন মাদকের বিরুদ্ধে গালভরা বুলি ও অভিযান চলছে, অন্যদিকে ঠিক তখনই কিছু অসাধু চক্রের ছত্রছায়ায় জেলার আনাচে-কানাচে জমজমাটভাবে চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা, ভারতীয় পণ্য পাচার, আইপিএল ও অনলাইন জুয়া।
প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে চলছে মাদক ব্যবসা?
সাধারণ মানুষের মনে আজ একটাই প্রশ্ন—মাদকের বিরুদ্ধে এত অভিযান ও প্রচারণার পরও মাদকের স্পটগুলো এত শক্তিশালী অবস্থানে টিকে থাকে কীভাবে? সচেতন মহলের বদ্ধমূল ধারণা, কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতাদের ম্যানেজ করেই মাদক কারবারিরা তাদের এই অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে। অর্থের প্রভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা চান, সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করুক, যাতে কোনো অপরাধী অর্থের প্রভাবে পার পেয়ে যেতে না পারে।
যুবসমাজের ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে
মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি পরিবার, সমাজ ও গোটা রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ এই সর্বনাশা নেশার ছোবলে নিজেদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ হারাচ্ছে। পরিবার হারাচ্ছে তাদের আদরের সন্তানকে, আর সমাজ হারাচ্ছে তার সবচেয়ে মূল্যবান মানবসম্পদকে।
বিচারিক দুর্বলতা ও আইনের ফাঁকফোকর
মাদক নির্মূলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কঠোরতা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। জনগণের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে খুব সহজেই বেরিয়ে আসে এবং পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। দ্রুত বিচার, শক্তিশালী তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই কেবল এই মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব।

মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে যেসব পদক্ষেপ জরুরি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সচেতন মহল মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে বাঁচাতে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাদক ব্যবসায়ী ও নেপথ্যের গডফাদারদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। মাদক মামলার দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করে আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে।
সীমান্ত ও প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি বাড়িয়ে মাদকের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধের বিকল্প নেই
মাদক নির্মূলের এই লড়াই শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা ও সচেতন নাগরিকদের একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, মাদক ব্যবসায়ীদের লাভের অঙ্কের চেয়ে আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ অনেক বেশি মূল্যবান।
‘মাদককে না বলি, সুস্থ-সুন্দর সমাজ গড়ি’—এই স্লোগানকে ধারণ করে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার এখনই সময়। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থের দাপট কিংবা ক্ষমতার ছত্রছায়া যেন কোনোভাবেই মাদক ব্যবসায়ীদের রক্ষা করতে না পারে। প্রভাবশালীদের নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে যুবসমাজকে রক্ষার জোর দাবি জানিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদকবিরোধী অভিযান-নাগরিকসভা ও জেলাজুড়ে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য নিয়ে এ প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন ‘জনপ্রশাসন’-এর জেলা প্রতিনিধি আমিরজাদা চৌধুরী…
জনপ্রশাসন/ এজেসি/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২০ জুন ২০২৬
