থানচি: নদী, ঝরনা আর পাহাড়ের অনন্য মেলবন্ধন যেখানে

সবুজ পাহাড়ের ক্যানভাস ঘেঁষে রূপালি ফিতার মতো বয়ে চলা সাঙ্গু নদী, আর তার বুকে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের এক মুকুটধারী রাজা।

বলছিলাম প্রকৃতির অপার বিস্ময়—বান্দরবানের থানচির কথা। যেখানে নদী, ঝরনা আর পাহাড়ের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছে এক রূপকথার রাজ্য। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ও প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের জন্য থানচি এখন এক চিরসবুজ স্বপ্নের ঠিকানা।

দুই পাহাড়ের বুক চিরে আপন গতিতে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। আর সেই রুপালি নদীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের দেশের এক মুকুটধারী রাজা।

স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত বংডহ বা রাজা পাথর নামে। নীল পানি, চিরসবুজ পাহাড় আর ছোট-বড় অসংখ্য পাথরের এই সাম্রাজ্য এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে এক আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য।

রাজা পাথরের ইতিহাস ও লোকগাথা: ​স্থানীয় মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খুমী ও খিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই পাথর অত্যন্ত পবিত্র। প্রচলিত আছে, বহু বছর আগে এক সাধক দিব্যজ্ঞান লাভ করে জানতে পারেন, সাঙ্গু নদীতে গুপ্তধনের অস্তিত্ব রয়েছে। সেই গুপ্তধনের সন্ধানে তিনি আরাকান থেকে কালাডাইন নদ পাড়ি দিয়ে থানচির এই অঞ্চলে আসেন এবং এক বিশাল পাথরের ওপর ধ্যানমগ্ন হন। পরে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় ভুলবশত তাঁর মাথার পাগড়ি বা মুকুটটি ওই পাথরের ওপর রেখেই চলে যান। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই মুকুট আজও পাথরের চূড়ায় দৃশ্যমান। মারমা ভাষায় ‘বং’ মানে পাগড়ি বা মুকুট এবং ‘ডহ’ মানে বড় বা রাজা। সেই থেকে এর নাম হয়েছে ‘বংডহ’ বা রাজা পাথর। এই বংডহ এবং এর কাছাকাছি থাকা ‘ক্যহপাজ্জা’ (দেবতার পাথর) ঘিরে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় ও পবিত্র আবহ।

পরিবেশ রক্ষা আর স্থানীয়দের আহ্বান: ​পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পবিত্রতা রক্ষা নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বংডহ পাথরকে স্থানীয়রা দেবতা কিংবা পবিত্র স্থান জ্ঞান করায় পর্যটকদের আচরণে যেন তার অবমাননা না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।

​তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমা বলেন, ‘বংডহ আমাদের সংস্কৃতির এবং প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। বহু বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই পাথরকে শ্রদ্ধা করে আসছেন। এখন এখানে অনেক পর্যটক আসেন, যা আমাদের স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে পর্যটকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা প্রকৃতির ক্ষতি করবেন না। প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলে নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত করবেন না।’

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা পর্যটকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, থানচির বংডহ পাথর ও ক্যহপাজ্জা অঞ্চল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের নতুন ঠিকানা। পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার জন্য আমরা স্থানীয় প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছি। তবে পর্যটকদেরও মনে রাখতে হবে, এটি একটি পবিত্র পাথর এবং সংবেদনশীল পরিবেশগত এলাকা। পাথর এবং প্রকৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে তবেই এই সৌন্দর্যের আনন্দ সবার নেওয়া উচিত।’

​​​বৈচিত্র্যের শেষ ঠিকানা: ​সবুজ পাহাড় আর নীল নদীর এই অপূর্ব মিলনস্থলে দাঁড়ালে বোঝা যায়, বাংলাদেশের প্রকৃতি কতটা বৈচিত্র্যময় ও রহস্যঘেরা। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ের কোলে সাঙ্গু নদীর বুকে শুয়ে থাকা এই পাথরের রাজ্য যেন একটুকরো স্বর্গ। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং পর্যটকদের সচেতনতা বজায় থাকলে থানচির এই বংডহ পাথর ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

জনপ্রশাসন/কেএ/২৫/০৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *