এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী আধা-সামরিক বাহিনী ‘বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি)’ এখন আর কেবল নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীতে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী, এই বাহিনীকে একটি স্মার্ট, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।
আধুনিক কমব্যাট প্রশিক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং প্রশাসনিক কাজের ডিজিটালাইজেশন এই বাহিনীর কর্মপরিধিকে করেছে আরও বিস্তৃত ও গতিশীল।
অপারেশনাল সক্ষমতায় নতুন দিগন্ত: বাহিনীর সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকার নিয়েছে বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া-২০২৬ এবং ‘স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিক্স (এসআইঅ্যান্ডটি)’-এর বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সদস্যদের মধ্যে এক নতুন পেশাদারিত্বের সঞ্চার করেছে। কেবল দেশীয় প্রশিক্ষণ নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে বাহিনীটি এখন প্রতিনিয়ত নিজেদের ঝালাই করছে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ: প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাহিনীটি এখন আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট করেছে।
ডিজিটাল মিডিয়া সেল: নিজস্ব অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘প্রান্তিক কণ্ঠস্বর’ চালুর মাধ্যমে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত তথ্য প্রবাহকে আধুনিক করা হয়েছে।
প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন: আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের সেবাকে আরও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল রূপান্তর ও সেবার সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী: আকাশ থেকে স্থলপথ: দেশের অতি-গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (KVI) সুরক্ষায় আনসার বাহিনী এখন এক অপরিহার্য নাম। দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় মোতায়েন রয়েছে বাহিনীটি। এছাড়া, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে আনসার সদস্যদের ভূমিকা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে করেছে সুরক্ষিত।
গ্লোবাল কানেক্টিভিটি: বৈদেশিক কর্মসংস্থান: আনসার সদস্যরা কেবল দেশের সুরক্ষাই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন। বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষায়িত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে:
জাপান মিশন: পুরুষ সদস্যদের জন্য ‘সিক্স জি ওয়েল্ডিং’ এবং ৫২০ জন নারী সদস্যের জন্য ৯০ দিনের নিবিড় জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ।
ইউরোপীয় বাজার: মলদোভাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ৩০০ জন নারী সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
জনকল্যাণ ও সামাজিক বিপ্লব: ৬১ লক্ষ সদস্যের এই বিশাল বাহিনী তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক পরিবর্তনের বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে:
স্বাস্থ্যসেবায় নিরাপত্তা: চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে দেশের ৫০০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ হাজার আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যা চিকিৎসক ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দালালচক্র দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্গঠন: বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও পাহাড়ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উদ্ধারকারী দল হিসেবে বাহিনীটির ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
সামাজিক সচেতনতা: ইউনিয়ন পর্যায় থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজারের অধিক দলনেতা-দলনেত্রীর মাধ্যমে মাদকবিরোধী অভিযান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও নারী ক্ষমতায়নে আনসার বাহিনী বর্তমানে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই বাহিনী আজ তার ৬৮ বছরের পথচলায় প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক, মানবিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্মার্ট বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আনসার ও ভিডিপি আজ কেবল জননিরাপত্তার রক্ষক নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের এক শক্তিশালী অংশীদার।
জনপ্রশাসন/কেএ/ জেডআরসি/ ১২ জুলাই ২০২৬
