ডিজিটাল হাটে সুবিধার আড়ালে প্রতারণার ফাঁদে গ্রাহক

তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে কেনাকাটা এখন হাতের মুঠোয়। ঘরে বসেই পশু শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বা গ্যাজেট—সবই মিলছে ডিজিটাল হাটে। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে এক শ্রেণির অসাধু চক্র গড়ে তুলেছে প্রতারণা ও ভেজালের এক বিশাল নেটওয়ার্ক।

কয়েকটি ভুঁইফোড় ও লাইসেন্সবিহীন চক্র ই-কমার্সকে হাতিয়ার করে মেতে উঠেছে কোটি কোটি টাকার প্রতারণায়। কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স নেই, নেই কোনো স্থায়ী শোরুম বা দোকান—অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে দিয়ে গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলছে প্রতারক চক্র।

সম্প্রতি রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। অভিযানে বিএসটিআইর পরীক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন (ছাড়পত্র) ব্যতীত নিম্নমানের শিশু খাদ্য ও কসমেটিক বিক্রির অভিযোগে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ছয় লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছে।

অভিযানে আলমাস সুপার শপে বিএসটিআইর পরীক্ষণ ও ছাড়পত্রবিহীন নিম্নমানের শিশু খাদ্য, যেমন—চকলেট, ফ্লেভার ড্রিংস, গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন পণ্য এবং কসমেটিক বিক্রির প্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

একই অভিযানে অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সোফিয়াস বিউটি হাউসের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কসমেটিক বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাবেকুন নাহার।

বিএসটিআইর পক্ষে অভিযানে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাফায়েত হোসেন। এ সময় বিএসটিআইর কর্মকর্তা আহসান হাবিব খান উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন।

বিএসটিআই জানিয়েছে, ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন পণ্য নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী বাজার তদারকি এবং মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও আরও জোরদারভাবে অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের কেনাকাটার সময় বিএসটিআই-এর অনুমোদিত ও মানসম্মত পণ্য ক্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের ওপর আর্থিক প্রতারণার নতুন এক ধারা নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব। তথ্য গবেষণা প্ল্যাটফর্মটির এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কীভাবে নারীদের লক্ষ্য করে স্ক্যাম বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছে।

এসব বিজ্ঞাপনে ‘ঘরে বসে আয়’, ‘গৃহিণীদের জন্য উপযুক্ত’ কিংবা ‘রিমোট জব’–এর মতো ভাষা দিয়ে নারীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। কেউ সাড়া দিলে বিভিন্ন ফি বাবদ ধাপে ধাপে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এমনই এক প্রতারণার শিকার ঢাকার সাথী আক্তার (ছদ্মনাম)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিজ্ঞাপন দেখে তিনি আবেদন করেছিলেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল এটি গৃহিণীদের জন্য ঘরে বসে করার মতো খুচরা কাজ। শুরুতে অল্প লাভ দেখিয়ে তাকে আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। একপর্যায়ে স্বামীর কাছ থেকে ধার করে তিনি ৯৭০ টাকা হারান। টাকার অঙ্ক বড় না হলেও লজ্জা ও দোষারোপের ভয়ে তিনি বিষয়টি কাউকে বলতে পারেননি। পরে স্বামী জানতে পেরে রাগারাগিও করেন। সাথীর ভাষায়, ‘জিনিসটা লজ্জার না? কীভাবে কাউকে বলি?’

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বিজ্ঞাপনে প্রায়ই বাংলাদেশের পরিচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজের নাম ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞাপনগুলোতে দারাজের নামে রিমোট চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাস্তবে এমন কোনো প্রকল্প নেই বলে নিশ্চিত করেছে ই–কমার্স প্রতিষ্ঠানটি। প্রতারণা চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বার্নার ফেসবুক পেজ, অস্থায়ী ডোমেইন এবং দারাজের কাছাকাছি নামের ভুয়া ওয়েবসাইট। দারাজ নিশ্চিত করেছে, এগুলো ভুয়া।

এসব আর্থিক প্রতারণার বিজ্ঞাপন মেটার নীতিমালার পরিপন্থি হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিজ্ঞাপনগুলো চালু রয়েছে। বরং মেটার নীতিমালা বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, কোনো ব্যবহারকারী যদি একবার এমন বিজ্ঞাপনে আগ্রহ দেখান, তবে অ্যালগরিদম তাকে বারবার একই ধরনের বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করে।

মেটা একটি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পরিচালনা করে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো মেটারই মালিকানাধীন। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে থাকে।

ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট এ এম ফারুকের মতে, মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। বিজ্ঞাপনের ভাষা, ভিজ্যুয়াল এবং ব্যবহারকারীর পূর্ববর্তী অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম অনুমান করে, কে বিজ্ঞাপনে বেশি সাড়া দিতে পারেন। ফলে ‘ঘরে বসে আয়’ বা ‘গৃহিণীদের জন্য’–এর মতো ভাষা ব্যবহার করলে আগে এ ধরনের কনটেন্টে সাড়া দেওয়া ব্যবহারকারীদের কাছেই বিজ্ঞাপন বেশি পৌঁছাতে পারে।

নারী আইনজীবীদের সংগঠন জাস্টিসিয়া ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্কের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নাজিয়া নূরে জারিনের মতে, এটি নারীদের লক্ষ্য করে প্রযুক্তিনির্ভর একধরনের অপরাধ। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কায় অনেক নারী প্রতারণার শিকার হলেও অভিযোগ করতে দ্বিধা করেন। প্রতারকেরা সচেতনভাবেই নারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নীরবতার সুযোগ নেয়, আর প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন কাঠামো ভুক্তভোগী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তোলে।

গ্লোবাল সিন্ডিকেশন: প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে গড়ে ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের স্ক্যামের ফাঁদে পড়ছে। আর প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রায় ১৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ! যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, সিঙ্গাপুর ও ব্রাজিলের মতো ১৬টি উন্নত ও উদীয়মান দেশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, গত তিন বছরে প্রায় ২২ কোটি মানুষ সরাসরি ডিজিটাল স্ক্যামের শিকার হয়েছে। এই ধারা হিসাব করলে বিশ্ব জনসংখ্যার এক-অষ্টমাংশ মানুষ এখন সাইবার অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে।

অপরাধের আধুনিক অস্ত্র: এআই এবং মোবাইল ভিশিংমোবাইলভিত্তিক ফোনকল ও এসএমএস এখনো প্রতারণার সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যম (৬০ শতাংশের বেশি)। কিন্তু ভয়ের কারণ হলো, অপরাধীরা এখন আর পুরোনো পদ্ধতিতে বসে নেই। তারা ব্যবহার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। ভয়েস ক্লোনিং (Voice Cloning): এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনার খুব কাছের কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে ফোন করা হয় এবং বলা হয় তিনি কোনো বিপদে পড়েছেন, দ্রুত যেন টাকা ব্যাংক বা মোবাইল ওয়ালেটে ট্রান্সফার করা হয়। একে বলা হচ্ছে ‘ভিশিং’ (Vishing)।

করপোরেট লস: গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে এই স্ক্যামাররা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে মোট ১.০৩ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৩ হাজার কোটি) ডলার হাতিয়ে নিয়েছে, যার একটি সেন্টও আর ফেরত পাওয়া যায়নি। এমনকি পাকিস্তান, কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের মোট জিডিপির (GDP) ৩ শতাংশেরও বেশি অর্থ হারিয়েছে এই ডিজিটাল স্ক্যামের কারণে।

মুক্তি কোন পথে : প্রযুক্তির এই বাঁধভাঙা জোয়ারকে থামিয়ে দেওয়া অসম্ভব, আর ই-কমার্স বা ডিজিটাল লেনদেন বর্জন করে আদিম যুগে ফিরে যাওয়াও কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে এই চোরাবালি থেকে বাঁচতে হলে রাষ্ট্র এবং ভোক্তা—উভয়কেই রণকৌশল বদলাতে হবে।

রাষ্ট্রের করণীয়: এই খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি অনলাইন পেজের জন্য ডিবিআইডি (DBID) বা ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো পেজ বিজ্ঞাপন দিতে গেলে তাদের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স ও ভৌত ঠিকানার প্রমাণ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার জন্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সরকারকে কঠোর চুক্তিতে আসতে হবে। সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে, এই চক্রগুলোর ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/রকেট) অ্যাকাউন্টের উৎস ধরে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ১৪ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *