ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে পুরোদমে

রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেলগেট থেকে রেলপথ ধরে হেঁটে মগবাজার, ওয়্যারলেস ও মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত এলে এখন আর আকাশ দেখা যায় না। পুরো পথজুড়ে মাথার ওপর দানবাকৃতির এক বিশাল ছাদ। বদলে যাওয়া এ দৃশ্যপটের কারণ নির্মাণাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। দেশের অন্যতম বড় এ অবকাঠামো প্রকল্পের কাজও এগিয়েছে অনেকটা।

তবে এ প্রকল্পের যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না। কখনও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্ব, কখনও অর্থসংকট, আবার কখনও আদালতের স্থগিতাদেশ— সবকিছুই বাধা হয়ে সামনে এসেছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে। ফলে কোনো অংশে এক বছর, আবার কোনো অংশে দেড় বছর পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে। এরপরও থেমে নেই কাজ। বর্তমান গতিতে নির্মাণকাজ এগোতে পারলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বহুল আলোচিত পান্থকুঞ্জ পার্ক-সংলগ্ন র‌্যাম্প চালু করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ করার আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পের নথি থেকে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রথম ধাপের (বিমানবন্দর থেকে বনানী) ৯৯.৯৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপের (বনানী থেকে মগবাজার) ৮৪.৮১ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপের (মগবাজার থেকে কুতুবখালী) ২০.৪৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির সার্বিক ভৌত অগ্রগতি এখন ৮০ শতাংশ।

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কারওয়ান বাজার রেলগেটের কাছে একাধিক র‌্যাম্পের জন্য পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। কয়েকটি পিলারের ওপর গার্ডারও বসানো হয়েছে। এখানকার একটি র‌্যাম্প বিয়াম ফাউন্ডেশনের পাশ দিয়ে হাতিরঝিলের ওপর দিয়ে কারওয়ান বাজার–বাংলামোটর সড়কের ওপর এবং মেট্রোরেল লাইনের নিচ দিয়ে পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় গিয়ে নামবে। এই অংশেও পিলার নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। পান্থকুঞ্জ এলাকায় এসে র‌্যাম্পটি দুটি ভাগে বিভক্ত হবে। একটি অংশ যাবে পলাশীর দিকে, অন্যটি যাবে বিমানবন্দরের দিকে। এ ছাড়া এই অংশে তিনটি পিলারের ওপর গার্ডার স্থাপন করা হয়েছে।

এই এলাকা ঘুরে আরও দেখা গেছে, কারওয়ান বাজার রেলগেট, মগবাজার, ওয়্যারলেস ও মালিবাগ পর্যন্ত গার্ডার স্থাপনের কাজ শেষে ঢালাই করা হয়েছে। এরপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি খিলগাঁওয়ের অতীশ দীপঙ্কর সড়কের বিভাজকের মাঝ দিয়ে যাবে। এ অংশে পিলার নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। তবে খিলগাঁও ফ্লাইওভার এলাকায় এখনো কোনো পিলার নির্মাণ করা হয়নি। খিলগাঁও ফ্লাইওভারের পর বাসাবো এলাকা থেকে আবার কমলাপুর কন্টেইনার ডিপো পর্যন্ত পিলার নির্মাণের কাজ দৃশ্যমান। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী অংশেও কয়েকটি পিলার নির্মাণ করা হয়েছে।

দেশের প্রথম দ্রুতগতির উড়ালসড়ক ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মালিবাগ-কুতুবখালী অংশের নির্মাণকাজ প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ ছিল (২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে)। প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিরোধের জেরে ঋণদাতা ‘চীনের এক্সিম ব্যাংক’ অর্থছাড় স্থগিত রাখায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও তখন বিমানবন্দর-কারওয়ান বাজার অংশে যান চলাচল চালু ছিল, তবে প্রকল্পের বাকি অংশের কাজ ছিল থমকে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা তখন জানিয়েছিলেন, কারওয়ান বাজার-মালিবাগ অংশে ঠিকাদাররা নিজস্ব অর্থায়নে সীমিত পরিসরে কিছু কাজ করতে পেরেছেন। তবে মালিবাগ-কুতুবখালী অংশে কাজ শুরু হলেও অর্থসংকটের কারণে তা আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। চলমান জটিলতার সমাধান হলে দ্রুতই নির্মাণকাজ আবার শুরু হবে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প পরিচালনার জন্য গঠিত ‘ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি লিমিটেডের’ মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকেই সংকটের সূত্রপাত। শুরুতে একক মালিক ছিল থাইল্যান্ডের ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। পরে তারা ৪৯ শতাংশ শেয়ার চীনের শ্যাংডং সিএসআই ও সিনোহাইড্রোর কাছে বিক্রি করে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে ঋণের সুদ পরিশোধ নিয়ে তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত ইতাল-থাই মালিকানা থেকে বাদ পড়ে।

ওই সময় প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতার বলেছিলেন, ঠিকাদারদের মধ্যকার জটিলতার কারণে এক্সিম ব্যাংক প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করেনি। ফলে নির্মাণকাজে গতি আসেনি। এর মধ্যে যে সামান্য কাজ হয়েছে, তা ঠিকাদাররা নিজেদের ইকুইটি বা নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করেছেন।

পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল অংশে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সম্প্রসারণ প্রকল্পকে ঘিরে পরিবেশবাদীদের আইনি লড়াইয়ের কারণে প্রায় এক বছর নির্মাণকাজ স্থবির ছিল। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর একটি রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল এলাকায় নির্মাণকাজে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন এবং পার্কটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশনা দেন। পরে সরকার এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলেও আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতও হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। এর ফলে ওই অংশের নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ ছিল, এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য পান্থকুঞ্জের হাজারো গাছ কাটা হয়েছে এবং হাতিরঝিলের জলাধারের অংশ ভরাট করা হয়েছে, যা পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রকল্পটি যথাযথ পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল এবং এতে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবুজ উন্মুক্ত স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলেছিলেন, যানজট নিরসন ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের স্বার্থেই এ সংযোগ সড়ক প্রয়োজন।
পরবর্তীতে আদালতের নির্ধারিত কিছু শর্ত মেনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে ২০২৬ সালের শুরুতে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাজ এখন পূর্ণগতিতে এগোচ্ছে এবং পান্থকুঞ্জের র‌্যাম্প আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে চালু করা সম্ভব হতে পারে।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম এস আকতার বলেছেন, মগবাজার থেকে মালিবাগ পর্যন্ত সমস্ত কাজ হয়ে গেছে, গার্ডারও বসে গেছে। মালিবাগ থেকে খিলগাঁও পর্যন্ত কলাম বসানো হয়েছে। গার্ডারও বসেছে। কমলাপুর স্টেশন ইয়ার্ডেও আমাদের গার্ডারের কাজ চলছে, কলাম উঠে গেছে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীতে কিছু কাজ হয়েছে। সেখানে কলাম ও ক্রসবিমের কাজ চলছে।

তিনি বলেন, পান্থকুঞ্জ এলাকাতেও কাজ চলছে। হাতিরঝিল অংশের কাজও হয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে খুলে দেওয়া যায় কি না। বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত পুরো কাজের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৮০ শতাংশ।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না, এমন প্রশ্নে প্রকল্প পরিচালক বলেন, আপনারা দেখেছেন পান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিলে আমরা এক বছর কাজ করতে পারিনি। সেখানে অনেক জটিলতা ছিল। আমাদের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য।

এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভূমি অধিগ্রহণ, আদালতের মামলা বা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে কাজ বিলম্বিত হলে কনসেশনেয়ার বা বিনিয়োগকারীদের নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পূর্ণ সুফল পেতে হলে এটিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে একই সময়ে যুক্ত করতে হবে। কারণ উত্তরবঙ্গ থেকে আসা ভারী যানবাহন আশুলিয়া হয়ে সরাসরি দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যেতে পারলে রাজধানীর ভেতরে যানবাহনের চাপ কমবে এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু দুটি প্রকল্পের একটি শেষ হয়ে অন্যটি পিছিয়ে গেলে যানবাহন আবার ঢাকার ভেতরেই প্রবেশ করবে, ফলে যানজট কমানোর লক্ষ্য পূরণ হবে না। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন মালবাহী পরিবহন নিশ্চিত করে এটিকে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত করার লক্ষ্যও ব্যাহত হবে।

এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগে থেকেই ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রশাসনিক জটিলতা সমাধানের জন্য পৃথক সহায়ক প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। এতে কনসেশনেয়ার নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করে দ্রুত পরিচালনায় যেতে পারবে এবং বিনিয়োগের প্রত্যাশিত রিটার্নও সময় মতো পাবে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর প্রভাব আরও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ও উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ১৪ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *