আড়িয়াল খাঁর বুক চিরে ‘বালু-উৎসব’, পাড়ে পাড়ে ঘরভাঙার নিঃশব্দ কান্না

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন ড্রেজারের কর্কশ শব্দ আছড়ে পড়ে আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে, তখন হোগলপাতিয়া গ্রামের মানুষের চোখে ঘুম আসে না, বুকে আসে এক অজানা আতঙ্ক। যে নদী একসময় পলিমাটি দিয়ে সোনায় মোড়ানো ফসল ফলাত, আজ কিছু মানুষের সীমাহীন লোভ আর প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসবে সেই নদীই হয়ে উঠেছে এক ক্ষুধার্ত রাক্ষস। নদী তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে গ্রাস করছে একের পর এক বসতভিটা, সাজানো সংসার আর সোনালী আবাদি জমি। আড়িয়াল খাঁর পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর নদীর কলতান শোনা যায় না, শোনা যায় মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু হারানো হাজারো মানুষের বুকফাটা হাহাকার আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

শর্ষেক্ষেত থেকে আশ্রিত জীবন: নিঃস্ব মানুষের আর্তনাদ: মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. এনামুল আকন। একসময় ১০ বিঘা জমিতে সোনা ফলিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে শুরু হওয়া নদীভাঙন, আর সাম্প্রতিক সময়ের অবৈধ বালু উত্তোলন তাঁর শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া শেষ দুই বিঘা জমি আর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে তিনি এখন অন্যের মাত্র আট শতাংশ জমিতে আশ্রিত।

অশ্রুসজল চোখে এনামুল বলেন, ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার পর থেকেই নদী ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করতেও ভয় লাগে। যারা এসব করছে তারা খুবই প্রভাবশালী। এখন আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।

একই গ্রামের টিটল আকনের গল্পটাও আলাদা নয়। गोलाভরা ধান আর ফসলি জমির মালিক টিটল এখন সব হারিয়ে নদীর ওপারে সামান্য ৬ শতাংশ জমিতে নতুন করে ঘর তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, আগে এই এলাকায় নদীভাঙনের কথা কেউ জানত না। ড্রেজার বসার পর থেকেই সব ওলটপালট হয়ে গেছে। কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতির কারণে এখানে কেউ মুখ খুলতে পারে না।

বিপন্ন শৈশব, আতঙ্কে কাটে রাত: আড়িয়াল খাঁ নদীর করাল গ্রাসে শুধু বসতভিটাই যাচ্ছে না, হারিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নও। চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে এলাকার শিশুদের পড়াশোনা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। স্থানীয় শিক্ষার্থীরা জানায়, বর্ষাকালে নদীর ভয়ংকর রূপ এবং নৌপথের ঝুঁকির কারণে অনেক সময় তারা স্কুলেই যেতে সাহস পায় না।

নদীর কিনারায় কোনোমতে টিকে থাকা পরিবারগুলোর প্রতিটি রাত কাটে অজানা আতঙ্কে। স্থানীয় বাসিন্দা জলিল বেপারী ও বিল্লাল হোসাইন জানান, রাতভর ড্রেজারের শব্দে ঘুমানো যায় না। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে উল্টো হুমকি-ধমকির শিকার হতে হয়। অনেক পরিবার ইতিমধ্যে ৫ থেকে ৭ বার পর্যন্ত তাদের ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে।

দায় এড়ানোর খেলা ও ভয়ের সংস্কৃতি: নদীভাঙনের এই তীব্রতার পেছনে স্থানীয় কিছু মানুষের মাটিকাটার লোভও দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে। ঝাউদি ইউপি চেয়ারম্যানের চাচাতো ভাই জাফর হাওলাদার জানান, তাঁর নিজের ফলদ বাগান নদীগর্ভে চলে গেছে। নদীতীরের মাটি ড্রেজার-সংশ্লিষ্টদের কাছে বিক্রি করার কারণে ভাঙন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

মাটি বিক্রির অভিযোগে অভিযুক্ত শামীম আকন অবশ্য দায় এড়াতে চাইলেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত জবাব, “আমি শুধু আমার জমির মাটি বিক্রি করেছি। ড্রেজার আমার নয়। অন্যের জমি ভাঙলে তার দায় আমার ওপর বর্তায় না।”

এদিকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই অবৈধ উৎসব চললেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এক প্রকার অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। হোগলপাতিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী স্পষ্টই স্বীকার করেন, বালু উত্তোলনের সাথে জড়িতরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় প্রতিবাদ করলে তাঁর নিজের ওপরও হামলার আশঙ্কা রয়েছে। আর ঝাউদি ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা বললেও, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে কোনো ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ পাননি বলে দাবি করেন।

প্রশাসনের আশ্বাসে মিলবে কি স্থায়ী সমাধান: এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান জানান, ঝাউদি ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন শেষে অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে।

অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের দাবি করা হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব এবং মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার জানান, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং এই কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

কাগজে-কলমে প্রশাসনের অভিযান আর প্রকল্প পাসের আশ্বাস থাকলেও, বাস্তবে আড়িয়াল খাঁর বুক থেকে ড্রেজার সরেনি। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এক একটি পরিবারের স্বপ্ন। যদি অনতিবিলম্বে এই অবৈধ বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করা না যায় এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা না হয়, তবে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে আরও অনেক গ্রাম। প্রশাসন কি পারবে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাত থেকে আড়িয়াল খাঁ নদী আর তার পাড়ের অসহায় মানুষদের রক্ষা করতে? এই প্রশ্ন এখন মাদারীপুরের ভাঙনকবলিত হাজারো মানুষের।

জনপ্রশাসন/কেএ/১৯ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *