উদ্বোধনের পর কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর; কিন্তু যে আলোয় ঝলমল করার কথা ছিল উড়াল সড়কটি, তা এখন চির অন্ধকারে ঢাকা। উদ্বোধনের পরই প্রায় দেড় শতাধিক স্ট্রিট লাইট ও বৈদ্যুতিক তার একে একে উধাও হয়ে গেছে। এ চিত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কুমিল্লা পদুআর বাজার বিশ্বরোড উড়াল সড়কের।
রাতের আঁধারে এই অতিগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। অথচ, কোটি টাকার সরকারি সম্পদ কীভাবে রাতারাতি গায়েব হয়ে গেল এবং কেনই বা বছরের পর বছর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব নেই সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কাছে।
অন্ধকারে সওজের অবহেলা, ঝুঁকিতে যাত্রী ও চালক
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৫০৮ মিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটির অধিকাংশ স্ট্রিট লাইটের খুঁটি কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো বাতি নেই। কোথাও আবার বৈদ্যুতিক সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ফলে সন্ধ্যার পর পুরো ফ্লাইওভার অন্ধকারে ডুবে যায় এবং প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
অপরাধের অভয়ারণ্য পদুয়ার বাজার
স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্ধকারের সুযোগে ফ্লাইওভারে ছিনতাই, চলন্ত যানবাহনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও মাদকসেবীদের আড্ডাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় এসে পদুয়ার বাজার এলাকায় নামা অনেক যাত্রীই বিভিন্ন সময়ে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তারা।
পরিবহন চালক হানিফ জানান, রাতে অনেক সময় এখানে গাড়ি থামাতে হয়। তখন ছিনতাইকারীরা অন্ধকারে ওত পেতে থাকে। আলো না থাকায় যাত্রীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোতালেব হোসেন বলেন, বছরের পর বছর ফ্লাইওভারটি অন্ধকার হয়ে আছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি অপরাধও বাড়ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।
নিলয় নামের এক স্থানীয় দোকানদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চার বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। এই দীর্ঘ সময়ে একদিনও ফ্লাইওভারের লাইট জ্বলতে দেখিনি। এটি কুমিল্লার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হলেও কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই।
দায় এড়ানোর চেষ্টা কর্তৃপক্ষের?
অনুসন্ধানে জানা যায়, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ফ্লাইওভারটি ২০১৮ সালে উদ্বোধনের পর এসব স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের কিছুদিনের মধ্যেই একে একে লাইট ও বৈদ্যুতিক তার উধাও হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও সেগুলো আর পুনঃস্থাপন করা হয়নি।
এ বিষয়ে কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আদনান ইবনে হাসান বলেন,
ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় প্রায় ১৫০টি স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ লাইট ও বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে যায়। আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে লাইটগুলো পুনরায় স্থাপন ও সচল করা হবে।
অন্যদিকে, কুমিল্লা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা নিজের দায় এড়াতে গিয়ে বলেন,
ফ্লাইওভারের লাইট বহু বছর ধরেই বন্ধ। উদ্বোধনের পরপরই লাইট ও বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে যায়। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই অবস্থা ছিল। এখন স্থায়ীভাবে কীভাবে স্ট্রিট লাইটগুলো সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্বোধনের পরপরই কোটি টাকার সরকারি সম্পদ চুরি হয়ে যাওয়ার পরও কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতা ও “বরাদ্দ” পাওয়ার অজুহাত কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রতিদিন হাজারো মানুষের জানমালের নিরাপত্তা যেখানে জড়িত, সেখানে অনতিবিলম্বে এই ফ্লাইওভারে আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কুমিল্লা সওজ ও প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
জনপ্রশাসন/কেএ/১৯ জুলাই ২০২৬
