২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের পর পেরিয়েছে ৮ বছর। এখনও শৃঙ্খলা ফেরেনি সড়কে, সেখানে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। গত সাড়ে সাত বছরে সড়কেই প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।
২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৬৪ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। এই সাড়ে সাত বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৪৮ হাজার ৭১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুল ও মাদরাসার শিক্ষার্থী ৩ হাজার ৩২৮ জন। এটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মোট শিক্ষার্থীর ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। আর ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ৪ হাজার ৩৬ জন, যা মোট শিক্ষার্থী মৃত্যুর ৫৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৮৪১ জন মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ছিল। এটি মোট নিহত শিক্ষার্থীর ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।
পথচারী হিসেবে যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় ১ হাজার ৯২৩ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ২৬ দশমিক ১১ শতাংশ। যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ৯২৭ জন বা ১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এ ছাড়া বাইসাইকেল ও রিকশার আরোহী হিসেবে ৫১৯ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক পেঁচিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৫৪ জন বা ২ দশমিক ০৯ শতাংশ শিক্ষার্থী।

সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ১৪৯ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে আঞ্চলিক সড়কে। এটি মোট শিক্ষার্থী মৃত্যুর ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। গ্রামীণ সড়কে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৯৪৭ জন বা ২৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। শহরের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ৭৮৬ জন বা ২৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৪৮২ জন, যা মোট মৃত্যুর ২০ দশমিক ১২ শতাংশ।
পথচারী হিসেবে নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রামীণ সড়কে সবচেয়ে বেশি ৭২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি মোট পথচারী শিক্ষার্থী মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং বাড়ির আশপাশে খেলার সময় অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় বেশি নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে।
অন্যদিকে, ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে বেশি নিহত হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে বেশি ঘটেছে।
বাইসাইকেল আরোহী শিক্ষার্থীরা থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল এবং অনিরাপদ মালবাহী যানবাহনের ধাক্কায় বেশি নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশ ঘটেছে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে।
অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক পেঁচিয়ে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর জন্য ব্যক্তিগত অসতর্কতাকে দায়ী করা হয়েছে। বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৯৩ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭১৯ এবং ২০২১ সালে ৯৩৬।
২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৮৫ শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। ২০২৩ সালে নিহত হয়েছে ১ হাজার ১৫৩ জন। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭৩ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ১৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯১ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। গত সাড়ে সাত বছরে অসাবধানে রেললাইন পার হওয়ার সময় এবং কানে হেডফোন ব্যবহার করে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে ১ হাজার ২৩৭ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পেছনে সাতটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও অনিরাপদ যানবাহন, নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা।
এ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণার অভাব, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর মানসিকতা, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা এবং অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরে অন্তত একবার সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচার কার্যক্রম আয়োজনের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি উদ্যোগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং শ্রেণি পরীক্ষায় সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশ্ন রাখার কথা বলা হয়েছে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনমুখী প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি, অনিরাপদ যানবাহন বন্ধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের সড়কে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
কোনোভাবেই যেন অপ্রাপ্তবয়স্করা মোটরসাইকেল চালাতে না পারে, সে জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। ওই ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকাসহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা অভূতপূর্ব অহিংস আন্দোলন করেছিল। এরপর আট বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জনপ্রশাসন/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৮ জুলাই ২০২৬
