দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ কক্সবাজার জেলার মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এখন বিকল। আর তাতেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে নেমে এসেছে মহাবিপর্যয়। এই সংকটে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা বাসা-বাড়ির রান্নায়, সিএনজি স্টেশনে- এমনকি শিল্প খাতেও। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির চরম মাশুল গুনতে গিয়ে এখন অর্থনীতি ও জনজীবন—উভয়ই খাদের কিনারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট থেকে ২১৫ কোটিতে নেমে আসায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস নেমেছে, ফলে দেশজুড়ে চলছে চরম লোডশেডিং। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছানোয় গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন নেমে এসেছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে।
গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে।
গ্যাস সরবরাহ ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৭০০ মিলিয়নে নামায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫,২০০ মেগাওয়াট থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ফলে আগস্টের প্রথম চার দিনে দেশে গড় বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩,৫১২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।
এর পাশাপাশি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে অবৈধ সংযোগ নিতে গিয়ে সঞ্চালন লাইনের ক্ষতি হওয়ায় ওই অঞ্চলে সরবরাহ সাময়িক বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ ০-১ পিএসআইয়ে নেমে আসায় পরিবহনচালকেরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বাসা-বাড়িতে জ্বলছে না চুলা, অসহায় পরিবার
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফজলে রাব্বি সৌরভ জানান, গ্যাস না থাকায় সপ্তাহজুড়ে তাদের রেস্টুরেন্টের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চারজন ব্যাচেলর একসঙ্গে থাকেন তারা। রান্নার জন্য লোক রাখা হলেও দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস না থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। রাত ১২টার পর কিছুটা গ্যাস এলেও তখন রান্নার লোক পাওয়া যায় না।

মিরপুর ৬০ ফিট সড়কসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সুকন্যা আমীরও একই সমস্যায় পড়েছেন। গ্যাসের সংকটের কারণে তিনি বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল গুনতে হচ্ছে, অথচ গ্যাস সংযোগের বিলও দিতে হচ্ছে।
নতুন বাজার এলাকার প্রাইভেটকার চালক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, বেশিরভাগ পাম্পেই গ্যাসের চাপ নেই। যেসব পাম্পে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ কারণে সপ্তাহজুড়ে তিনি গাড়ি বের করাও বন্ধ রেখেছেন।
শুধু ঢাকায় নয়, আশপাশের নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর অনেক এলাকাতেও গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সাভার ও গাজীপুরের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্প, ক্যাপটিভ পাওয়ার, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে।
তীব্র হচ্ছে সিএনজি সংকট
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি ও সিএনজি গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কোথাও কোথাও এলপিজি বিক্রি বন্ধ রয়েছে। আবার অনেক সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে চরম অনিশ্চয়তা ও মারাত্মক আয় সংকটে দিন কাটাচ্ছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা।
রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে প্রতিদিনই অটোরিকশা, অ্যাম্বুলেন্স ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। একাধিক অ্যাম্বুলেন্স চালক জানান, তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায়, তা নিয়ে দূরপাল্লার রোগী পরিবহনে ঝুঁকি থেকে যায়। মাঝপথে গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই দূরের ট্রিপ নিতে চাইছেন না।
সংকটের কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের আয়ও কমে গেছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন দুই দফায় গ্যাস সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায় আট ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। এরপর বাকি সময় গাড়ি চালিয়ে মালিকের জমা দেওয়ার পর হাতে খুব সামান্য আয় থাকে। তবে আয় কমলেও মালিকের নির্ধারিত দৈনিক জমার পরিমাণ কমেনি এক টাকাও।

মেরুল বাড্ডার একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব অটোরিকশাচালক নরুল ইসলামের সঙ্গে। আয় কমে যাওয়ার পর মালিক জমা কম নিচ্ছেন কি না জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলে ওঠেন, ‘এক টাকাও কম নেয় না।’
জানা গেছে, রাজধানীতে সিএনজি অটোরিকশার সারাদিনের জমা নির্ধারিত রয়েছে ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং হাফ বেলার জমা ৮০০ টাকা। তীব্র গ্যাস সমস্যা থাকুক কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিনের আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমুক, মালিকদের নির্ধারিত দৈনিক জমা ঠিকই গুণতে হচ্ছে।
শিল্প খাতেও সংকট
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, কারখানাগুলো বর্তমানে সক্ষমতার মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানিয়েছেন, গ্যাস ছাড়া ডাইং কারখানা চালানো সম্ভব নয় বলে শ্রমিকদের অনুরোধে তারা ৫ থেকে ৭ আগস্টের ছুটি আরও বাড়িয়েছেন। সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস দৈনিক ২৪ হাজার পাউন্ড সক্ষমতার বিপরীতে মাত্র ১০ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদন করতে পারছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম।
কাচ ও ইস্পাত শিল্পে সংকট আরও মারাত্মক। চট্টগ্রামের পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, গ্যাসের চাপ ৭৫ পিএসআইয়ের নিচে নামলে কয়েক শ কোটি টাকার চুল্লি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, সাময়িকভাবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল দিয়ে কারখানা চালালেও দীর্ঘ মেয়াদে তা অসম্ভব। বিসিএমইএর তথ্যমতে, ঢাকা ও আশপাশের ২০টি সিরামিক কারখানায় গ্যাসের চাপ ০-৩ পিএসআইয়ে নেমেছে।
কোহিনূর কেমিক্যালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট গোলাম কিবরিয়া সরকার এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানিয়েছেন, তাদের উৎপাদন যথাক্রমে ২০ ও ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

মহেশখালীর দুর্ঘটনা তাৎক্ষণিক কারণ হলেও, বিশেষজ্ঞরা একে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন। একদিকে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১০.৬০ ডলার থেকে বেড়ে ২১.৪৫ ডলারে ঠেকেছে, অন্যদিকে শেভরনের বিবিয়ানা ফিল্ড থেকে গত চার মাসে দৈনিক প্রায় ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো থেকে বছরে ৩ কোটি ঘনফুট স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘একটি গোষ্ঠী আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ না করার কারণেই এই সংকট’।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের নানা উদ্যোগ
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আগামী ১৩ বছর এলএনজি আমদানিরও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। গ্যাস সংকট নিরসনে সহায়তা চেয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় পুরোনো কূপ থেকেও গ্যাস পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেছেন, পুরোনো কূপে গ্যাস পাওয়া গেলে সেটিই হবে তাৎক্ষণিক সমাধান। পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া থেকে ক্রায়োজনিক আইএসও ট্যাংক আগামী অক্টোবরের মধ্যে দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি পরিবহন করা হবে। একইভাবে ভোলার গ্যাস এসব ট্যাংকের মাধ্যমে এনে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের উদ্যোগ রয়েছে।
এদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা টার্মিনালের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের কাজ করছেন। প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে টার্মিনাল চালুর কথা বলা কঠিন হলেও দ্রুত এটি সচল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত আরও একাধিক এফএসআরইউ স্থাপনের কাজ চলছে। পাশাপাশি মাতারবাড়িতে ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসির আওতায় গ্যাস উৎপাদনে দরপত্র আহ্বান এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কাজও চলছে।
জনপ্রশাসন/কেএ/ ০৪ আগস্ট ২০২৬
