গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন তিনি। এই পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্কে যে দৃশ্যমান টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা ক্রমশ স্বাভাবিকতার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা দেখা দিলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন শুরু হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম সারির বিশ্বনেতা হিসেবে তাকে অভিনন্দন জানান এবং দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান। যদিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে দুই দেশের আন্তরিক ইচ্ছা, চেষ্টা ও পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি আরো পরিস্কার হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে দুই দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে।
শেখ হাসিনা ইস্যু ও আইনি প্রক্রিয়া
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সংবেদনশীল বিষয়। তবে বর্তমান সরকার বিষয়টিকে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বদলে আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কৌশল নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনা বা নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কেউ যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অস্থিতিশীল করার মতো কোনো বক্তব্য বা কার্যক্রমে অংশ নিতে না পারেন।

বুধবার (০৫ আগস্ট) সাউথ এশিয়ান ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার একটি মতবিনিময় ঘিরে ঢাকার উদ্বেগের পর, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জোর দিয়ে বলেছেন, পলাতক কোনো অভিযুক্তের বিবৃতির কারণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হোক—তা ঢাকা চায় না।
সম্ভাব্য দিল্লি সফর ও ব্রিকস সম্মেলন
কূটনৈতিক বরফ গলার বড় একটি ইঙ্গিত হতে পারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর। চলতি মাসের শেষের দিকে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই সফর অদূর ভবিষ্যতেই অনুষ্ঠিত হবে।
তিস্তা-গঙ্গা পানিবণ্টন ও ভূরাজনীতি
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত ইস্যু তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি)’ চীনের সহায়তার বিষয়টি যৌথ বিবৃতিতে উঠে আসে।
ভারতের কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ (চিকেনস নেক)-এর কাছাকাছি হওয়ায় এই প্রকল্পের দিকে নিবিড় নজর রাখছে দিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পানিবণ্টন সংক্রান্ত যেকোনো ইস্যু বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমেই সমাধান করা হবে।
জনপ্রশাসন/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৫ আগস্ট ২০২৬
