বিলের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক!

গ্রামীণ বাংলার রূপ-রসে ভরা আড়িয়াল বিল আর তার সুস্বাদু দেশি মাছের খ্যাতি ছড়িয়ে আছে দেশজুড়ে। রাজধানীর খাবারের পাতেও এ বিলের কই, বাটা কিংবা টেংরার কদর আলাদা। কিন্তু এই রূপসী প্লাবনভূমির জলের তলে যে নিঃশব্দে এক বিষাক্ত ঘাতক দানা বাঁধছে, তার খবর হয়তো এতদিন আমাদের অজান্তেই ছিল।

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক সত্য—আড়িয়াল বিলের মাছে বাসা বেঁধেছে অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা বা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় জানা যায়, বিলের জনপ্রিয় পাঁচ প্রজাতির দেশি মাছের মাংসপেশি ও অন্ত্রে অনুবীক্ষণিক প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এক নতুন আলোকপাত করেছে।কই মাছে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।

গবেষণায় আড়িয়াল বিলের পাঁচ প্রজাতির মাছ নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়—কই, বাটা, মেনি (নান্দিনা), গুলশা টেংরা ও পুঁটি।

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, সর্বভুক প্রকৃতির কই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। তলানি ও প্লাঙ্কটনের সাথে মিশে থাকা প্লাস্টিক সহজে গ্রহণ করায় কই মাছের পেটে ও মাংসে এটি জমেছে বেশি।

বর্ষা, শীত ও শুষ্ক—তিন ঋতুতেই পরীক্ষা করা প্রতিটি কই মাছের ভোজ্য মাংসপেশিতে গড়ে অন্তত একটি করে প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, বাটা, মেনি ও গুলশা টেংরায় এর পরিমাণ কিছুটা কম হলেও ছোট আকারের পুঁটি মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা ছিল সবচেয়ে কম।

গবেষকদের মতে, মাছের অন্ত্র বা ফুলকায় প্লাস্টিক পাওয়া নতুন কিছু নয়; তবে মানুষের খাওয়ার উপযোগী মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়াটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নতুন চিন্তার বিষয়। বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে আশপাশের প্লাস্টিক বর্জ্য ধুয়ে বিলে মেশায় পানিতে দূষণ বাড়ে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে এলে এসব কণা তলদেশে গিয়ে জমা হয়।

গবেষণায় বিলের প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩২টি এবং প্রতি কেজি তলানিতে ১২ থেকে ১২৭টিরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব কণার সিংহভাগই সুতার মতো সূক্ষ্ম তন্তু, যা প্রধানত কাপড়ের কৃত্রিম সুতা, গৃহস্থালির ব্যবহৃত পানি এবং ফেলনা প্লাস্টিক বা মাছ ধরার জাল থেকে আসে। পলিমারের দিক থেকে এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপাইলিন ও পলিস্টাইরিন—যেগুলো সাধারণত প্লাস্টিক ব্যাগ ও মোড়কে ব্যবহৃত হয়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতামাছের দেহে প্লাস্টিকের উপস্থিতিতে এখনই সরাসরি বড় কোনো স্বাস্থ্যের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকেরা।

গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেছেন, শরীরে জমতে থাকা এ ধরনের উপাদান হয়তো ৫-১০ বছরে বোঝা যাবে না। কিন্তু ২৫-৩০ বছর পর, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এর ক্ষতিকর প্রভাব গিয়ে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের রক্ত, প্রস্রাব ও অন্যান্য অঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের দেখা মিলছে। ইতিমধ্যে দেশে বাজারে থাকা বেশ কিছু টুথপেস্ট, দুধ, চিনি ও ভোজ্যতেলেও প্লাস্টিক কণা শনাক্তের দাবি উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরীর মতে, অপরিকল্পিত প্লাস্টিক ব্যবহার ও ভঙ্গুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই সংকটের মূল কারণ। এই দূষণ থেকে বাঁচতে হলে দৈনন্দিন জীবনে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে।

বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পুরোপুরি পরিহার করা। প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখা বা ওভেনে ব্যবহার বন্ধ করা। কাচ, স্টিল বা সিরামিকের সামগ্রীতে অভ্যস্ত হওয়া। স্থানীয় নদী ও বিল রক্ষায় প্লাস্টিক বর্জ্যের আধুনিক ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আড়িয়াল বিলের জলজ সম্পদ শুধু মুন্সিগঞ্জ বা ঢাকার খাদ্য চাহিদা মেটায় না, এটি আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই প্লাস্টিক দূষণ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ০৫ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *