হাম-ডেঙ্গুর চোখ রাঙানিতে ৫ দিনেই মৃত্যু ২৫, আক্রান্ত ৫৭৬২

একদিকে একবুক আশা নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের কচি শরীরে হামের তাণ্ডব, অন্যদিকে বর্ষার পানিতে ডেঙ্গুবাহী মশার নিরব আক্রমণ—এই দুই সংক্রামক ব্যাধির চোখ রাঙানিতে আগস্টের শুরুতেই দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছে।

আগস্টের প্রথম ৫ দিনে (১ থেকে ৫ আগস্ট) দুটি ঘাতক ব্যাধিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন। আর আক্রান্ত হয়েছে ৫৭৬২ জন। প্রসূতি ওয়ার্ড থেকে আইসিইউ—প্রতিটি কোণে স্বজনদের কান্না আর শয্যা না পাওয়ার আকুতি ভারী করে তুলেছে হাসপাতালগুলোর পরিবেশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোর আইসিইউ ও শিশু বিভাগে শয্যা সংকট চরমে পৌঁছানোয় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

হামের তাণ্ডব: ৫ দিনে ১৬ শিশুর মৃত্যু

মাসটির প্রথম পাঁচ দিনে সারা দেশে ফুটে উঠেছে করুণ দৃশ্য। টিকা না পাওয়া বা অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীরে লালচে র‍্যাশ, তীব্র জ্বর আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন অভিভাবকরা। এই অল্প কটি দিনে হাম ও এর আনুষঙ্গিক জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬ জন শিশু—অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ জনের মৃত্যু হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রয়েছে প্রায় ৩,২০০ শিশু। অপুষ্টি ও দেরিতে হাসপাতালে আনার কারণে আক্রান্তরা নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতায় ভুগছে।

ডেঙ্গুর ছোবল: ৫ দিনে ভর্তি আড়াই হাজার, মৃত্যু ৯

শ্রাবণের বিদায় ও ভাদ্রের শুরুতে বৃষ্টিপাত বাড়ার সাথে সাথে প্রতিটি জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ৩১ জুলাই থেকে ৪ আগস্টের মধ্যে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২,৫৬২ জন রোগী এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। চিকিৎসকরা জানান, আক্রান্তদের বড় অংশে ‘DENV-3’ ভ্যারিয়েন্ট চিহ্নিত হওয়ায় রোগীরা দ্রুত ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’-এ চলে যাচ্ছেন।

একই এডিস মশার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়াও ছড়ায়। যদিও এতে মৃত্যুহার কম, তবে দীর্ঘদিন তীব্র গিঁটের ব্যথা, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এটি। একই মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দুটি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হলেও বাস্তবে সেই সমন্বিত উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।

সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের দিকনির্দেশনা

জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তারা বলেছেন শিশুদের জ্বর বা শরীরে লালচে ছোপ ছোপ দাগ দেখা দিলে দ্রুত আলাদা রাখতে হবে। শ্বাসকষ্ট, বমি বা তীব্র পাতলা পায়খানা শুরু হলে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে। যেকোনো জ্বরের প্রথম দিনেই ‘NS1’ পরীক্ষা করানো নিশ্চিত করা জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেছেন, হাম ও ডেঙ্গু একই সময়ে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। আতঙ্ক না ছড়িয়ে দ্রুত পরীক্ষা ও সঠিক রোগ নির্ণয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

আইইডিসিআর পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকীর মতে, DENV-3 সেরোটাইপের প্রভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হতে পারে। তাই জ্বরকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ফুলের টব, ছাদের কোণা, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র বা পানির ড্রামের জমা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। সূর্যোদয়ের পরের দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘণ্টা এডিস সবচেয়ে সক্রিয় থাকে, তাই ব্যক্তিগত সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আইইডিসিআর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, প্রতি বছর সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয় না। শুধুমাত্র কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; প্রয়োজন কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জনবল, বৈজ্ঞানিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

ডা. মুশতাক হোসেন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর। হামের শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার জন্য এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই মূল কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার ও জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এসব রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জোড়া ধাক্কা সামলাতে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন দেশকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার একমাত্র পথ।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ০৫ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *