কর্মকর্তাদের কেউ তিন দায়িত্বে, কারো কাজই নেই

জনপ্রশাসনে বর্তমানে পদের চেয়ে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি। এরপরও সরকার ‘আস্থাভাজন’ কর্মকর্তা খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে যাঁদের ওপর সরকারের আস্থা রয়েছে, তাঁদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, শত শত কর্মকর্তা কোনো কাজ ছাড়াই বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে বসে বসে বেতন নিচ্ছেন।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দলীয়করণের কারণেই প্রশাসনে এমন ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এই ভারসাম্য ঠিক করতে না পারলে প্রশাসনিক কাজে ব্যাঘাত ঘটাবে। ফলে সমস্যায় পড়বে সরকার।

পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি
প্রশাসনে বর্তমানে পদোন্নতি হয়েছে পদ ছাড়াই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রেষণসহ অতিরিক্ত সচিবের পদসংখ্যা ৩৩৭টি, কিন্তু কর্মরত আছেন প্রায় ৩৫০ জন। যুগ্ম সচিবের ৫০২টি পদের বিপরীতে কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ১,৫০০ জন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৬৫০ জন কর্মকর্তা বর্তমানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে আছেন, যাঁদের কোনো নির্দিষ্ট কাজ নেই। বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বসে বসেই পাচ্ছেন তারা। এটা নিয়মের ভেতরেই হচ্ছে। এছাড়া, অনেক কর্মকর্তাকে অগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানে মূলত কোনো কাজ থাকে না।

আস্থাভাজনদের কাঁধে একাধিক দায়িত্ব
বিএনপি সরকার বর্তমানে প্রশাসন চালাতে গিয়ে আস্থাভাজন কর্মকর্তার সংকটে পড়েছে। তাই যাঁদের বিশ্বস্ত মনে করা হচ্ছে, তাঁদের ওপরই একাধিক দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়গুলোতে খোঁজ নিলে এমন বহু কর্মকর্তার নাম উঠে আসে:

অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির নিজ দপ্তরের কাজের পাশাপাশি জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ এবং কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগের প্রধান হিসেবে তিন দায়িত্ব পালন করছেন। আরেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসানও ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার—এই তিন অনুবিভাগ সামলাচ্ছেন।

অতিরিক্ত সচিব আবদুল মান্নান অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাজ করছেন। অতিরিক্ত সচিব হাবিবুন নাহার অতিরিক্ত হিসেবে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন।

অতিরিক্ত সচিব তাহমিনা ইয়াসমিন একসঙ্গে তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য শিক্ষা, বাণিজ্য, শিক্ষা, শিল্প, ভূমি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন যুগ্ম ও অতিরিক্ত সচিবকে দু-তিনটি করে গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

বিগত সরকারের সুবিধাভোগীদের পরিণতি
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যাঁরা আস্থাভাজন ছিলেন, তাঁদের বর্তমানে ওএসডি করা হচ্ছে অথবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। গত ২৮ জুলাই ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময় তাঁরা ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

কাজের ধীরগতি ও বিশেষজ্ঞ মত
একজন কর্মকর্তার হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকায় কোনো কাজই ঠিকমতো হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “কোনো সরকারই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের পছন্দ ও রাজনৈতিক আদর্শের বাইরের কাউকে দায়িত্ব দিতে চায় না। এ কারণে এক কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হয়, যা কাজের গতি কমিয়ে দেয়।”

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের দলীয়করণের কারণে জনপ্রশাসন তার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি হারিয়েছে।

নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। তবে বর্তমান জনপ্রশাসনের এই চিত্র সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *