কবিতার ইশতেহার—একটি নির্মম সৌন্দর্যের পাঠ

জিয়াউল জিয়া: মিজান মাহমুধের “কবিতার ইশতেহার” বাংলা কবিতার প্রচলিত রীতির ভেতরে দাঁড়িয়ে লেখা কোনো স্বস্তিদায়ক কাব্যগ্রন্থ নয়; বরং এটি এক ধরনের অস্বস্তির নথি। এখানে কবিতা শুধু অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ এবং একজন নাগরিকের ভেতরকার সত্যকে উন্মোচনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে—এটি যেন কোনো কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং এক বিকল্প সংবিধানের খসড়া— যেখানে আইন নয়, নৈতিকতা কথা বলে। ক্ষমতা নয়, বরং বিবেক এখানে শাসন করে।

“কবিতাসংবিধান” অংশটি বইটির মেরুদণ্ড। এখানে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, বিচার, সাংবাদিকতা, ধর্ম, শিক্ষা—প্রতিটি বিষয়কে কবি নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। রাষ্ট্রকে তিনি কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা ক্ষমতার কাঠামো হিসেবে দেখেননি; বরং দেখেছেন মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি নৈতিক অবস্থান হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যেমন কাব্যিক, তেমনি গভীরভাবে রাজনৈতিক। কবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন—রাষ্ট্র তখনই অর্থবহ, যখন সে মানুষের পাশে দাঁড়ায়; অন্যথায় তা কেবল একটি শূন্য কাঠামো।

বইটির দ্বিতীয় অংশ “২৪-এর কবিতা” আরও তীব্র, আরও ব্যক্তিগত। এখানে কবি শুধু রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেন না, বরং পাঠককেও জিজ্ঞেস করেন—আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? “আমরাই বানাই স্বৈরাচার” কবিতায় যে আত্মসমালোচনার সুর রয়েছে, তা বাংলা কবিতায় খুব বেশি দেখা যায় না। কবি এখানে দায় চাপাননি কোনো একক শাসকের উপর; বরং দেখিয়েছেন, কীভাবে আমাদের ভয়, নীরবতা এবং সুবিধাবাদই স্বৈরাচারের জন্ম দেয়। একইভাবে “নির্মম ইতিহাস” কবিতাটি ইতিহাসের প্রতি এক নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে, যেখানে আবেগের চেয়ে দায়বোধ অনেক বেশি বড় হয়ে ওঠে।

ভাষার দিক থেকে মনে হতে পারে বইটি সরল, কিন্তু সেই সরলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তীব্রতা। এটি অলংকারনির্ভর কবিতা নয়; বরং ঘোষণামূলক, অনেকটা ম্যানিফেস্টোর মতো। অনেক জায়গায় মনে হয়—কবি যেন কবিতা লিখছেন না, বরং আদালতে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিচ্ছেন। এই শৈলী বাংলা সাহিত্যকে প্রথাগত ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছে।

নিঃসন্দেহে “কবিতার ইশতেহার” বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। কবি মিজান মাহমুধ এখানেই স্বতন্ত্র— যিনি সৌন্দর্যের জায়গায় সত্যকে বেছে নিয়েছেন, আর নান্দনিকতার জায়গায় দায়বোধকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তাই এই কবিতার বইটি পাঠককে স্বস্তি দেয় না; বরং অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্ন করতে শেখায়, এবং নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

সবশেষে বলা যায়, এটি এমন এক কণ্ঠস্বর, যা চুপ করে থাকতে চায় না। যে সময়কে আমরা এড়িয়ে যেতে চাই, এই বইটি সেই সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর সেখানেই “কবিতার ইশতেহার” তার প্রকৃত শক্তি খুঁজে পায়।

জনপ্রশাসন/ এমএম/ জেডআরসি/ ২৬ জুন ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *