রহস্যময় ‘তুঙ্গুসকা: ফের ধেয়ে আসছে মহাজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞ?

১১৮ বছর আগে সাইবেরিয়ার জনমানবহীন বনাঞ্চলে ঘটে যাওয়া এক অলৌকিক ও প্রলয়ঙ্কারী মহাজাগতিক বিস্ফোরণ আজও বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।

১৯০৮ সালের সেই অবিশ্বাস্য ঘটনার সূত্র ধরে মহাকাশবিজ্ঞানীদের মনে নতুন করে একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে-২০৩০ সালে কি আবারও পৃথিবীর বুকে ধেয়ে আসতে চলেছে তেমন কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয়? খবর এনডিটিভির।

তুঙ্গুসকার সেই অভিশপ্ত সকাল: ১৯০৮ সালের ৩০ জুন, তখন রাশিয়ায় চলছে রুশ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনকাল। সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত পোডকামেনায়া তুঙ্গুসকা নদীর অববাহিকায় তখন সকাল সোয়া ৭টা। হঠাৎ করেই স্থানীয় এভেনকি যাযাবর হরিণপালকেরা আকাশের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে যান।

তাদের বিবরণ অনুযায়ী, আকাশ চিরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে ধেয়ে আসছিল সূর্যের চেয়েও কয়েক গুণ উজ্জ্বল ও জ্বলন্ত একটি অগ্নিগোলক। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পুরো আকাশকে ঝলসে দিয়ে ঘটে এক কান ফাটানো বিকট বিস্ফোরণ। একের পর এক বজ্রপাতের মতো শব্দে কেঁপে ওঠে মাইলের পর মাইল এলাকা। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, শত শত মাইল দূরের ভূমিকম্প পরিমাপক যন্ত্রেও (সিসমোগ্রাফ) সেই কম্পন ধরা পড়েছিল। এমনকি ঘটনার পর টানা কয়েক দিন সারা বিশ্বের রাতের আকাশ অদ্ভুত রকমের উজ্জ্বল ছিল।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাকাশ রহস্য: এই ঘটনার পর কেটে যায় দীর্ঘ ১৯ বছর। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব এবং গৃহযুদ্ধের কারণে কোনো বিজ্ঞানী বা অভিযাত্রী দল সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। অবশেষে ১৯২৭ সালে সোভিয়েত একাডেমি অব সায়েন্সেসের ভূবিজ্ঞানী লিওনিড কুলিক প্রথম সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন, তা বিজ্ঞানীদের চেনা সমস্ত সমীকরণ ওলটপালট করে দেয়:

গাছের প্রজাপতি বিন্যাস: বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে ২৩ থেকে ৫৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাসে’ (Butterfly Pattern) প্রায় ২,১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকার লাখ লাখ গাছপালা উপড়ে পড়েছিল। বনের বিশাল বন্য হরিণের দল চোখের পলকে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

গর্ত বা উল্কাপিণ্ডের অনুপস্থিতি: চাঁদের বুকে বা পৃথিবীর অন্য কোথাও উল্কাপাত হলে মাটিতে বিশাল গর্ত বা ক্রেটার তৈরি হয় এবং উল্কার অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। কিন্তু তুঙ্গুসকায় বারবার অনুসন্ধান চালিয়েও কোনো গর্ত বা উল্কাপিণ্ডের বড় টুকরো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে: দীর্ঘদিন ধরে চলা এই রহস্যের জট খুলতে আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশন ও আধুনিক পদার্থবিদ্যার সাহায্য নিয়েছেন। নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক বসলো এবং কানাডীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্টিন কনোর্সের মতে, এটি কোনো সাধারণ উল্কাপাত ছিল না। এটি ছিল একটি ‘মেটিওরিটিক এয়ারবার্স্ট’ বা বায়ুমণ্ডলীয় উল্কা-বিস্ফোরণ।

মহাজাগতিক বস্তুটি সরাসরি মাটির বুকে আছড়ে পড়েনি। এটি প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উঁচুতে এসে প্রচণ্ড শক্তিতে বিস্ফোরিত হয়। এই ঘটনা বিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনা পুরোপুরি বদলে দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন, পৃথিবীকে ধ্বংস করার জন্য কোনো বস্তুর সরাসরি মাটিতে আঘাত করার প্রয়োজন নেই; বায়ুমণ্ডলে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণই আস্ত বনাঞ্চল বা শহর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

২০১৩ সালে রাশিয়ার চেলিয়াবিনস্ক শহরের আকাশে ঠিক এমনই একটি বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেটি আকারে তুঙ্গুসকার চেয়ে ১০ গুণ ছোট হলেও প্রচুর ঘরবাড়ির জানালার কাচ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল এবং অনেক মানুষ আহত হয়েছিল। এই চেলিয়াবিনস্কের ঘটনাই প্রমাণ করে যে তুঙ্গুসকার মডেলটি কতটা সত্য ছিল।

আমরা কি আবার কোনো বিপদের মুখে: অধ্যাপক মার্ক বসলো একটি চাঞ্চল্যকর গাণিতিক তত্ত্ব সামনে এনেছেন। তার মতে, তুঙ্গুসকার সেই বস্তুটি যদি পৃথিবীর সঙ্গে ৬১ বছরের কক্ষপথের সামঞ্জস্য থাকা কোনো বিশাল ‘মহাজাগতিক বস্তুপুঞ্জের’ অংশ হয়ে থাকে, তবে তার বাকি অংশগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে আবারও পৃথিবীর কক্ষপথে ফিরে আসতে পারে।

পৃথিবী কি সুরক্ষি : প্রশ্ন জাগতেই পারে, ২০৩০ সালে যদি সত্যিই তেমন কিছু ঘটে, তবে কি মানুষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে? বিজ্ঞানীদের মতে, ১৯০৮ সালের বস্তুটি দিনের বেলার আকাশ দিয়ে আসায় তখনকার টেলিস্কোপে ধরা পড়েনি। বর্তমানের সাধারণ টেলিস্কোপও সূর্যের আলোর কারণে দিনের বেলার গ্রহাণু দেখতে পায় না।

তবে আশার কথা হলো, আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান এখন অনেক এগিয়ে গেছে। বর্তমানে তৈরি হচ্ছে ‘নিও সার্ভেয়ার’ মতো অত্যাধুনিক স্পেস টেলিস্কোপ, যা মহাকাশের যেকোনো দিক থেকে আসা অদৃশ্য বা লুকিয়ে থাকা গ্রহাণু ও ধূমকেতুকেও বছরের পর বছর আগেই নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারবে। ফলে, ২০৩০ সালের ইঙ্গিত নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে রোমাঞ্চ বা আশঙ্কা থাকলেও, শত বছর আগের মতো হঠাৎ করে কোনো অপ্রস্তুত ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি পৃথিবীকে হতে হবে না বলেই আশা করা যায়।

জনপ্রশাসন/কেএ/১ জুলাই, ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *