মুদি দোকানের চেয়েও সহজলভ্য ফার্মেসি!

ওষুধ সংরক্ষণের নূন্যতম মানদণ্ডই মানছে না দেশের ৯৩ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্র। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ যেখানে জীবন বিপন্ন করার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে প্রতি মাসেই বাড়ছে আরও ২৩৭টি দোকানের সংখ্যা। ফলে প্রশ্ন উঠছে মুদি দোকানের চেয়েও কি সহজলভ্য হয়ে উঠল ফার্মেসি!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য সর্বোচ্চ ১০টি ওষুধের দোকান থাকা যুক্তিযুক্ত। সেই হিসাবে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ১ লাখ ৯০ হাজার ফার্মেসিই যথেষ্ট। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা—দেশে নিবন্ধিত দোকানের সংখ্যাই ২ লাখ ২৬ হাজার ছাড়িয়েছে। এর বাইরে প্রায় এক লাখ দোকান চলছে কোনো প্রকার নিবন্ধন ছাড়াই। ঘর থেকে পা ফেললেই যেন ওষুধের দোকান, অথচ গুণগত মানের বিচারে বেশির ভাগই চরম সংকটাপন্ন।

মডেলের নামে শুধু সাইনবোর্ড: শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) এবং সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ—একটি আদর্শ ফার্মেসির প্রধান শর্ত। কিন্তু দেশের ৯৩ শতাংশ ফার্মেসি এই শর্ত মানছে না। ওষুধের মান নিশ্চিত করতে যে ‘মডেল ফার্মেসি’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তার হার মাত্র ৭ শতাংশ।

ঢাবির ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার বলেন, “উন্নত বিশ্ব তো দূরের কথা, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এত কম দূরত্বে ওষুধের দোকান দেখা যায় না। আমাদের জনবসতি ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।”

গরমে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট: ওয়্যারহাউস থেকে রোগীর হাত পর্যন্ত ওষুধ পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপেই তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। বিশেষ করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে সামান্য বিচ্যুতি ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। শাহবাগ বা মিটফোর্ডের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে দিনের পর দিন সূর্যের তাপ আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ওষুধ রাখা হলেও, দায়িত্বরত অনেকেরই নেই সচেতনতা। অনেকের মতে, “অধিদপ্তর থেকেও কখনো এ নিয়ে বিশেষ সতর্ক করা হয়নি।”

নিয়ম ভাঙার উৎসব ও উদাসীনতা: ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ওষুধও প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে অবাধে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন স্বীকার করেন, “সামাজিক পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কঠোর হওয়া সম্ভব হয় না।” এছাড়া, বেশি বেতনের ভয়ে অধিকাংশ মালিক এ-ক্যাটাগরির গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিচ্ছেন না, যা মানসম্মত সেবা প্রাপ্তিতে বড় বাধা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ওষুধ সেবন করা হয় সুস্থ হওয়ার জন্য। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ফার্মেসি ও ভুল তাপমাত্রায় সংরক্ষিত ওষুধ যদি বিষে পরিণত হয়, তবে কার দায় নেবে কর্তৃপক্ষ? এখনই সময় এই ‘ওষুধ বাণিজ্যে’ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার। তাই শুধুমাত্র লাইসেন্স দেওয়া নয়, প্রতিটি দোকানের নিয়মিত গুণগত মান যাচাই করা। বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোকে মডেল ফার্মেসি স্থাপনে প্রণোদনা দেওয়া। সক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনার প্রবণতা থেকে রোগীদের বেরিয়ে আসা। অনিবন্ধিত দোকানগুলোর বিরুদ্ধে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি না করেই ধাপে ধাপে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।

জনপ্রশাসন/কেএ/০৯ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *