জেন–জি ঝড়: দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু হয়ে নয়া দিল্লি—দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের স্থিতাবস্থা আর প্রথাগত ক্ষমতার ঘরানা এক অভূতপূর্ব ঝাঁকুনি খেয়েছে। একে একে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত শাসকগোষ্ঠী, রাজপথে ক্ষমতা জাহির করেছে এক নতুন প্রজন্ম: জেন-জি। বাহ্যিকভাবে এ আন্দোলনগুলোকে প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোটা সংস্কার বা ডিজিটাল নজরদারির বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ মনে হলেও, গভীরে এটি আসলে এ অঞ্চলের পুরো ভূরাজনৈতিক সমীকরণকেই বদলে দিচ্ছে। যে দিল্লি, বেইজিং বা ওয়াশিংটন এতদিন নির্দিষ্ট কিছু শীর্ষ ‘এলিট’দের সাথে ছক কষে পুরো দক্ষিণ এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করত, রাজপথের তরুণদের এই বাঁধভাঙা জোয়ার এখন তাদের সমস্ত কূটনৈতিক অংক এক লহমায় বদলে দিয়েছে।

১. নিরাপত্তা বনাম জনরোষ: ভারতের আঞ্চলিক প্রভাবের ধাক্কা

 

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহাসিক ভূরাজনৈতিক প্রভাব বহুলাংশে নির্ভর করত এ অঞ্চলের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক এলিটদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর।

বাংলাদেশের উদাহরণ: ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে ভারতে তাঁর আশ্রয় নেওয়া দিল্লির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা দেয়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে উপেক্ষা করে কেবল সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রথাগত কৌশল তরুণ প্রজন্মের রাজনীতির মুখে কতটা ভঙ্গুর।

ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রচ্ছায়া: ২০২৬ সালে এসে ভারতের নিজস্ব জেন-জি আন্দোলন (প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্ব কেন্দ্রিক) প্রমাণ করে যে, কৌশলগত স্থিতিশীলতা কেবল সীমান্ত বা পরাশক্তি কূটনীতি দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব নয়। অভ্যন্তরীণ সামাজিক অসন্তোষ দেশের ভূরাজনৈতিক শক্তি ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে সরাসরি দুর্বল করতে পারে।

২. বেইজিং-দিল্লি প্রক্সি লড়াই ও কৌশলগত শূন্যতা

নেপাল ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো এ অঞ্চলে চীন ও ভারতের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে:

নেপালের অস্থিতিশীলতা: কেপি শর্মা অলির পদত্যাগের পর নেপালে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কাঠমান্ডুতে হিমালয় পারের ভূরাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও জটিল করেছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ (BRI) উদ্যোগ এবং ভারতের ঐতিহ্যগত প্রবাভাব—উভয়ই এখন নতুন কোনো স্থিতিশীল সরকার না পাওয়া পর্যন্ত থমকে আছে।

অ্যালাইমেন্ট পরিবর্তন: তরুণ প্রজন্ম প্রথাগত “ভারত-পন্থী” বা “চীন-পন্থী” ট্যাগ মেনে নিতে নারাজ। তারা আরও সার্বভৌম, অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল এবং স্বচ্ছ পররাষ্ট্রনীতির দাবি তুলছে, যা যেকোনো বহিরাগত পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।

৩. ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও ‘স্পিলওভার’ প্রভাব (Spillover Effect)

এই আন্দোলনগুলোর ভূরাজনৈতিক মাত্রার অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো সীমান্তহীন ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

২০২৫ সালে নেপাল সরকারের সোশ্যাল মিডিয়া ব্লক করার চেষ্টা বা বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট—কোনোটিই আন্দোলন থামাতে পারেনি।

এক দেশের জেন-জি আন্দোলনের কৌশল, স্লোগান এবং ডিজিটাল প্রতিরোধ স্পিলওভার প্রক্রিয়ায় সীমান্ত পেরিয়ে পাশের দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি দক্ষিণ এশীয় সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর প্রচলিত ‘তথ্য নিয়ন্ত্রণ’ ও স্বৈরাচারী শাসনের ধারণাকে বুড়ো আঙুল বানিয়ে একটি আন্তঃসীমান্ত তরুণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

৪. ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Global Supply Chain)

দক্ষিণ এশিয়া হলো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অন্যতম হাব। কিন্তু ভারতের ৪০% তরুণ গ্র্যাজুয়েটের বেকারত্ব কিংবা বাংলাদেশে সম্পদের চরম বৈষম্য (১০% মানুষের হাতে ৫৮% সম্পদ) এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

তরুণ জনগোষ্ঠীর এই অসন্তোষ যদি গৃহদাহ বা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় রূপ নেয়, তবে তা সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (Indo-Pacific) অঞ্চলের ভূকৌশলগত ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করবে।

‘ককরোচ ইন দ্য মেশিন’ প্রতিবেদনে উল্লেখিত তরুণদের এই গণজাগরণ কেবল অভ্যন্তরীণ শাসনের সংস্কারেই থেমে নেই। দক্ষিণ এশিয়ার শাসকবর্গ এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোকে এখন বুঝতে হবে—এই অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে হলে কেবল ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এলিটদের সন্তুষ্ট রাখাই যথেষ্ট নয়; বরং কোটি কোটি ক্ষুব্ধ, সংযুক্ত ও অধিকার সচেতন জেন-জি যুবসমাজের প্রত্যাশাকে মূল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জনপ্রশাসন/ কেএ /২৮ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *