চরিত্র হননই যেন শেষ অস্ত্র

আনোয়ার হাকিম : আমাদের এই উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশের মধ্যে কিছু বিষয়ে অদ্ভুত মিল রয়েছে। ভাষার ভিন্নতা, আবহাওয়ার বৈচিত্র্য আর অর্থনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা  থাকলেও খাসলত প্রায় অভিন্ন। আমরা গালাগালি, খিস্তিখেউড় করতে বেশ পারদর্শী। চুগলবাজী, চাপাবাজী, দলবাজী, দুর্নীতি ও স্বজন তোষণে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

বাছবিচারে সিদ্ধহস্ত। আমরা কথায় কথায় সুবচন শোনাই অথচ নিজের অবস্থান তার বিপরীত। আমরা অন্যকে ওয়াজ নসিহত করতে পারঙ্গম কিন্তু নিজের দিকে নজর দেই না। চুরি, চামারি, ছ্যাঁচড়ামিতে আমাদের জুড়ি নেই। অপরিষ্কার, ঘোলাটে ও কর্দমাক্ত পরিবেশ ঘাটাঘাটিতে আমরা বড়ই ওস্তাদ।

পরশ্রীকাতরতা আমাদের পরমপ্রিয় বিষয়। তাই, অন্যের অনিষ্টে আমরা চরম পুলকিত হই আর অন্যের ভালোত্বে ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরে যাই। অপরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করা, খোঁচা মারা আমাদের নিত্যকার অভ্যাস। অকথা-কুকথা বলতে না পারলে আমাদের বুক জ্বালা করে, কণ্ঠ অবধি গ্যাস্ট্রিকের বুদবুদ ফালাফালি করে। দুই নম্বরি কাজে আমরা অতিশয় দক্ষ। টাউটারি, বাটপারি, ফোঁপর দালালী আমাদের কাছে সবচেয়ে লাভজনক পেশা।

আমরা সারাক্ষণ ফন্দিফিকির করি, ছিদ্র তালাশ করে বেড়াই। ছিদ্র না পেলে ড্রিল মেশিন দিয়ে ‘ছিদ্র’ সৃষ্টি  করি। ভালো কিছু পেলে বা ভালো মানুষ কাউকে দেখলে প্রথমেই সন্দেহ পোষণ করি আর তক্কে তক্কে থাকি তার ডার্ক হিস্ট্রি খুঁজে বের করা যায় কিনা? যিনি যে পেশায় বা কর্মে নিয়োজিত তাকে কোনো কাজে বাগে আনতে না পারলে শেষ ও ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে চরিত্রে কালিমা লেপন করার জন্য প্রাণান্তকর প্রয়াস পাই। হাল আমলে এই রূপ চরিত্রনাশের প্রয়াস বেশ কার্যকর ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বড়ই লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।  

আমাদের গাঙ্গেয় এ অববাহিকায় যারা ইংরেজ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ হিসেবে কর্মরত ছিলেন তারাও স্থানীয় অধিবাসীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্মন্ধে যা বলে গেছেন তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। লর্ড টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলের একটি উক্তি উদ্ধৃত না করে পারছি না। তিনি লিখেছেন, “মহিষের যথা শৃঙ্গ, মৌমাছির যথা হুল, ব্যাঘ্রের  যথা থাবা, নারীর যথা সৌন্দর্য – বাঙালি জাতির তদ্রুপ প্রবঞ্চনা”। তিনি আরো বলেছেন , “বাঙালিরা দৈহিক দিক  থেকে ভঙ্গুর ও দুর্বল, নৈতিক দিক থেকে কাপুরুষ, অভ্যাসগতভাবে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, যোগসাজশকারী ও  জালিয়াত”।

আরেক ইংরেজ শাসক চার্লস গ্রাণ্টের অভিমত হলো, বাঙালিদের মধ্যে প্রবঞ্চনা ও জালিয়াতি এবং নিজ স্বার্থ সিদ্ধির  জন্য অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। মিথ্যাচার, আইন ও নিয়মের প্রতি অবজ্ঞা, লেনদেনে অবিশ্বাস, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, প্রতিহিংসা পরায়নতা প্রবল। আরেক ব্রিটিশ শাসক জন শো’র পর্যবেক্ষণ হলো, তারা ভীরু, দাসসুলভ,  অধীনস্থদের উপর উদ্ধত, প্রতারণাকে যোগ্যতা বলে মনে করে, মিথা সাক্ষ্য ও চাটুকারিতায় পারদর্শী এবং সত্যবাদিতার অভাব রয়েছে।

অন্যদিকে লর্ড ওয়েসলি বিভিন্ন জেলা শাসকদের কাছ থেকে স্থানীয় অধিবাসীদের সম্মন্ধে জানতে চাইলে ঢাকা, যশোর, বাখরগঞ্জ, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহী, রংপুরের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটগণ যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে গোপন প্রতিবেদন দিয়েছেন তা অন্যান্য ব্রিটিশ শাসকদের অনুরূপ। এগুলো কি এক কথায় উপড়ে ফেলে দেওয়া যাবে? বলাবাহুল্য উপনিবেশ টিকিয়ে রাখতে ব্রিটিশদের নানা ফন্দিফিকিরের মধ্যে বাঙ্গালিদেরকে এরূপে চিত্রায়নে বাড়াবাড়ি  বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব থাকতে পারে কিন্তু পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চান্ন বছরেও কি আমরা ব্রিটিশ সাহেবদের উল্লেখকৃত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে উড়িয়ে দিতে পেরেছি?

সময়ের পরিসরে আমরা প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছি, বৈশ্বিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য, অর্থনীতি সবকিছুতেই আমরা পরিসংখ্যানে প্রভূত উন্নতি যোগ করেছি। কিন্তু সামগ্রিক চরিত্রের কি উন্নতি করতে পেরেছি? নৈতিক অধঃপতনের শেষ ধাপে এখন আমাদের বিচরণ। কাকে মেরে কাকে ধরে যেনতেন প্রকারে উপরে উঠে যাবো এ চিন্তাতেই আমাদের সারাক্ষণ কেটে যায়।

অর্থই অনর্থের মূল এ কথা ছোটবেলায় পড়েছিলাম। তখন সেটার একরূপ পজিটিভ অর্থ ছিলো। আর এখন এটা অচল বলে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। অর্থই এখন দু:সময়ের একমাত্র অনুগত বন্ধু। বিপদে পড়লেই বোঝা যায় প্রকৃত এই বন্ধুর আসল রূপ। কাউকে সাহায্য করতে, সমাজে দানবীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে অর্থই এখন অন্যতম নিয়ামক। আপতকালে, বিদেশে বিভুঁয়ের পলাতক জীবনে এর অকুণ্ঠ সমর্থন মেলে। সে অর্থ ড্রেন থেকে টেনে তোলা হোক বা  কারো কলিজা চিড়ে আহরণ করা হোক; অর্থ অর্থই, মূল্যবান সম্পদ। এর প্রভাব পরিমাণের উপর নির্ভরশীল।

হাজার কোটি ক্লাবের সদস্য হতে পারলে দেশের শীর্ষ ধনীদের মধ্যে নাম অঙ্কিত হবে। রোশনাই বাড়বে, সকলের সামনে নমস্য হয়ে বুক চিতিয়ে যাচ্ছেতাই করা যাবে, টেণ্ডার, ইম্পোর্ট-এক্সপোর্ট, ব্যাংক, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যাবে। নিজের ঢাক ইচ্ছেমত বাজানো যাবে, অনায়াসেই প্রতিপক্ষের চরিত্রনাশ করা যাবে। ইচ্ছেমত হানি গার্লদের নিয়ে পরিব্রাজক হওয়া যাবে। ভিআইপি, সিআইপি সুবিধাও পাওয়া যাবে। শত কোটির মালিক হলে সমিতি, ফেডারেশন, পশ ক্লাবের সভাপতি, সেক্রেটারি হওয়া যাবে আর অলিগার্কের সহযোগী হিসেবে কিছু সুবিধা তো পাওয়া যাবেই।

বলছিলাম চরিত্রনাশ প্রসঙ্গে। আমরা যখন কাউকে করায়ত্ত করতে পারিনা, তখন তাকে পর্যুদস্ত করতে উঠেপড়ে লেগে যাই। তাতেও কাজ না হলে বহ্মাস্ত্র হিসেবে ডার্ক হিস্ট্রি ঘাটাঘাটি শুরু করি। তাতেও কাজ না হলে চরিত্রনাশের সকল আয়োজন সম্পন্ন করি। অডিও- ভিডিওর কাসুন্দি খুঁজে পেতে মরিয়া হই, পেলে পোষ্য মিডিয়ায় তা ছেড়ে দেই, ভাড়া করা ব্লোয়ার দিয়ে প্রমোট করাই। তাতেও কাজ না হলে হানি ট্র্যাপ, মানি ট্র‍্যাপ ফাঁদি। মোটকথা তাকে চৌদ্দহাত ডোবার জলে চুবিয়ে ছাড়ি।

আমরা নীতিনৈতিকতার ধার ধারি না। তাই, এখন আর কেউ বিশিষ্ট হয়ে উঠতে পারছেন না। অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকার মত কাউকে পাওয়াও যাচ্ছে না। ভাবটা এমন যে, “আমি অধম বলিয়া তুমি উত্তম হইবে কেন”? অথচ  একবারের জন্যও ভাবিনা, কবি নজরুলের ভাষায়, “চিরদিন কাহারও নাহি সমান যায়”। সম্পদ নাশ পুষিয়ে নেওয়া  যায়, অভাব কাটিয়ে উঠা যায় কিন্তু চরিত্র নাশ হলে তা আর পুনরুদ্ধার করা যায় না। অন্যের কৃতকর্মের গঠনমূলক সমালোচনার পথ পরিহার করে একে অপরের চরিত্রনাশের মাধ্যমে আমরা কি অর্জন করতে চাচ্ছি? আমরা কি পরস্পর অবিশ্বাসের সমাজ তৈরি করে চাচ্ছি জিঘাংসাকেই উসকে দিতে চাচ্ছি?

এভাবেই প্রতিনিয়ত পরিবার, সমাজ কলুষিত হচ্ছে। অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতার সংস্কৃতি চালু হচ্ছে। মূল্যবোধ মূল্যহীন হয়ে  যাচ্ছে। সুবচন উপ্ত না হয়ে গুপ্ত থেকে যাচ্ছে। কেউ হয়ত এখন এতে গা করছি না। কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। উত্তর প্রজন্মের কাছে ঠিকই তুলে ধরবে আমাদের এই সব দিনরাত্রির পাশা খেলার কাহিনীচিত্র। পরিবার থেকেই চরিত্র গঠন প্রক্রিয়া শুরু করার কথা।

শিক্ষাঙ্গনে সেটা শাণিত হওয়ার কথা। আর সমাজে তা অনুশীলনের কথা। কিন্তু এগুলো এখন নিছক কথার হয়ে থাকছে। শুরু করার, অনুশীলন করার, দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য আমাদেরকে আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে? আমরা কি আত্মবিনাশের পথে দৌড়াচ্ছি? তাতে কার কি লাভ হচ্ছে? আখেরে সবাই উলঙ্গ হয়ে যাচ্ছি। অতএব, সাধু সাবধান।সবার সুবোধ জাগ্রত হোক। #

লেখক: কলামিস্ট, সাবেক সচিব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *