অসুস্থ হলে মানুষের প্রথম গন্তব্য হওয়ার কথা চিকিৎসক বা হাসপাতাল। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে এখন চিকিৎসা নেওয়ার প্রথম পছন্দ ‘ফার্মেসি’। ছোটখাটো জ্বর-কাশি থেকে শুরু করে গ্যাস্ট্রিকের মতো জটিল সমস্যার সমাধানও মিলছে ওষুধের দোকানের কাউন্টার থেকেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিলিটি স্ট্যাটাস সার্ভে’র তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের এই ‘ফার্মেসি-নির্ভরতা’ এখন চরম পর্যায়ে।
পরিসংখ্যান কী বলছে: বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, গত ৯০ দিনে চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ শতাংশই সরাসরি ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়েছেন। এর বিপরীতে, সরকারি চিকিৎসকের কাছে গেছেন মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বেসরকারি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন ১১ দশমিক ৪ শতাংশ রোগী। সাধারণ রোগ হিসেবে পরিচিত জ্বর, সর্দি ও কাশিতে ফার্মেসিভিত্তিক চিকিৎসা গ্রহণের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ।
কেন ফার্মেসিতে মানুষের আস্থা বাড়ছে: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা এবং অর্থনৈতিক চাপই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। সাধারণ রোগীদের অভিযোগের জায়গাগুলো মূলত তিনটি:
অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার বোঝা: সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে গেলেই এক গাদা টেস্ট লিখে দেওয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে চিকিৎসকদের গোপন আঁতাতের অভিযোগও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল।
বিশাল খরচ ও হয়রানি: একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে ভিজিট দেওয়া এবং দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করা মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষের জন্য এক প্রকার বিলাসিতা। সেই তুলনায় ফার্মেসিতে বসে থাকা পল্লী চিকিৎসক বা আরএমপিরা হাতের কাছেই দ্রুত সেবা দিচ্ছেন।
সহজলভ্যতা: ফার্মেসিতে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে না, হয়রানি কম এবং কথা শোনার মতো একজন মানুষ (বিক্রেতা বা প্রশিক্ষিত কর্মী) তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়।
আয় ও লিঙ্গভেদে ভিন্নতা: বিবিএস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গরিব ও ধনী—উভয় শ্রেণিতেই ফার্মেসি চিকিৎসার প্রধান উৎস। গরিবদের ৬০ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং সবচেয়ে ধনী শ্রেণির ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ মানুষই ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে বেসরকারি উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে ধনীদের হার (২৭.৮৯%) গরিবদের (৮.০৩%) চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া লিঙ্গভেদে পুরুষরা নারী অপেক্ষা ফার্মেসি থেকে বেশি সেবা গ্রহণ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও দায়বদ্ধতা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পল্লী চিকিৎসক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এইচ এম জাহাঙ্গীর হোসেনের মতে, “এসব পল্লী চিকিৎসক বা ফার্মেসির কর্মীরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় ভিত্তি তৈরি করেছেন। সরকারি-বেসরকারি বড় চিকিৎসকদের কাছে গেলে রোগীরা যে হয়রানির শিকার হন, তা থেকে বাঁচতেই মানুষ ফার্মেসিমুখী হচ্ছে।”
অন্যদিকে, বিবিএস-এর দায়িত্বশীলরা বলছেন, তারা কেবল চিত্রটি তুলে ধরেছেন। কেন মানুষ এমন করছে, তার গভীরে গিয়ে গবেষণা করা এখন সময়ের দাবি।
চিকিৎসাক্ষেত্রে মানুষের এই ফার্মেসি-নির্ভরতা কি স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতা? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে না পারলে এই প্রবণতা কমবে না। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সেবার মান বাড়ানো এবং চিকিৎসকদের ভিজিট ও অপ্রয়োজনীয় টেস্টের ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি করা এখন অপরিহার্য। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবন স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
জনপ্রশাসন/ কেএ/ জেডআরসি/ ০৪ জুলাই ২০২৬
