রাজধানীর শাহবাগে শিশুদের কোলাহলে মুখরিত যে পার্কটি একসময় ছিল শৈশবের ঠিকানা, সেটি এখন রূপ নিয়েছে এক দীর্ঘশ্বাস আর জং ধরা কংক্রিটের স্তূপে। ‘আধুনিকায়ন’-এর নামে যে পার্কটি ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি তালাবদ্ধ করা হয়েছিল, তা সাত বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ৭৮ কোটি টাকার বাজেট ফুলেফেঁপে হয়েছে ৬০৪ কোটি টাকা। তবুও পার্কের ভেতরে রাইডের বদলে চোখে পড়ে সবজি বাগান আর ভবঘুরেদের আস্তানা।
রূপকথার শুরু, বাস্তবের বিড়ম্বনা: ১৯৭৯ সালে জাপানের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম এই শিশু পার্কটি শিশুদের বিনোদনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ প্রকল্পের দোহাই দিয়ে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কথা ছিল এক বছরের মধ্যে নতুন রূপে ফিরবে পার্ক। কিন্তু সেই ‘এক বছর’ পেরিয়ে এখন চলছে সপ্তম বছর।
যে কারণে এই দীর্ঘসূত্রতা: প্রকল্পটি কেন বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে, তার পেছনে উঠে এসেছে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অপর্যাপ্ত থাকায় কাজ শুরু করতেই চলে গেছে কয়েক বছর। পরবর্তীতে ডিএসসিসি নিজস্ব উদ্যোগে এটি গ্রহণ করলে নতুন করে নকশা ও বাজেট তৈরিতে নষ্ট হয় সময়। প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে উঠেছে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। মন্ত্রণালয় তাকে সরিয়ে দিয়ে বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।
অগ্রগতির অভাব: ডিএসসিসির দাবি অনুযায়ী রাইড কেনার প্রক্রিয়া চলছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো কর্মযজ্ঞ নেই। পুরো এলাকা জুড়ে যেন স্থবিরতা ভর করেছে।
এখন কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা: বর্তমানে পার্কটির নিয়ন্ত্রণ ডিএসসিসির হাতে থাকলেও, প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন নতুন প্রকল্প পরিচালকের অপেক্ষায় রয়েছে তারা। অন্যদিকে, ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন নতুন আশার কথা—”১৫টি রাইড বিদেশ থেকে আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। সব ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে পার্কটি খুলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছি আমরা।”
তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। পার্কের ভেতরে ড্রেনের কাজ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন নেই। দায়সারা তদারকিতে পার্কটি এখন বিনোদন কেন্দ্রের পরিবর্তে হয়ে উঠেছে পরিত্যক্ত ভূমি।
প্রত্যাশা ও প্রশ্ন: শহরের শিশুদের জন্য একটি উন্মুক্ত বিনোদন পার্কের অভাব দীর্ঘদিনের। ছয় শতাধিক কোটি টাকা খরচ করে আধুনিকায়নের নামে সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর অপেক্ষায় রাখাটা কতটা যৌক্তিক? নতুন পরিচালকের অধীনে কি আদৌ পার্কটি তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে, নাকি ২০২৭ সালের পর আরও একটি নতুন তারিখের অপেক্ষায় থাকতে হবে নগরবাসীকে?
জনপ্রশাসন/ কেএ/ জেডআরসি/ ০৫ জুলাই ২০২৬
