মোড়ক বদলাচ্ছে র‍্যাব, চূড়ান্ত হচ্ছে নতুন নাম ও রূপরেখা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার রক্ষাকবচ হিসেবে জন্ম নিলেও বিগত দুই দশকে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) পরিণত হয়েছিল গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা আর ভীতি প্রদর্শনের এক মূর্তিমান আতঙ্কে। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপ, মানবাধিকার সংস্থার সুপারিশ ও গুম কমিশনের ভীতিকর তথ্যের মুখে দাঁড়িয়ে ইতিহাস হতে চলেছে ‘র্যাব’ নামটি। তবে কোনো স্বাধীন বা নতুন বাহিনী হিসেবে নয়, পুলিশের অধীনেই মোড়ক বদলে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।

র‍্যাবের সেই বিতর্কিত তকমা ঝেড়ে ফেলে নতুন নাম ও রূপরেখা নির্ধারণে আগামী ২৯ জুলাই বসছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভা।

চার নামের লড়াই: টেবিল জুড়ে যে প্রস্তাবগুলো: র‍্যাবের বিলুপ্তির পর এর পরিচয় কী হবে, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। নতুন খসড়া অনুযায়ী টেবিলে রয়েছে চারটি সম্ভাব্য নাম-র‍্যাবের নিজস্ব পছন্দ: পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস (PPF)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিন বিকল্প-স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (SRF), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ফোর্স (RABF)।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ২৯ জুলাইয়ের বৈঠকেই চূড়ান্ত হবে ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস আইন-২০২৬’-এর খসড়া ও নতুন এই ব্যানার।

পুরনো বোতলে নতুন মদ: রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে একটি নতুন বাহিনী গড়ার কথা ভাবা হলেও, বাস্তবতায় সরকার ফিরেছে আগের পথেই।

আইজিপির নিয়ন্ত্রণে ডিজি: সংস্থাটির প্রধান বা মহাপরিচালক (ডিজি) পদে থাকবেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি সরাসরি আইজিপির অধীনে থেকে কাজ পরিচালনা করবেন।

সমন্বিত দল: আগের মতোই সেনাবাহিনী, পুলিশ, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী থেকে প্রেষণে আসা সদস্যদের নিয়ে এটি চলবে।

জবাবদিহিতার ফাঁদ আটকানো: কোনো সদস্য অপরাধ করলে ছাড় পাবেন না—যে বাহিনীর সদস্য, তাকে সেই বাহিনীর কঠোর আইন অনুযায়ী সাজা পেতে হবে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ: আসামি গ্রেপ্তার বা মালামাল জব্দের পর তা ঢাকঢাক-গুড়গুড় না করে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানায় সোপর্দ করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

র‍্যাবের পতনের পেছনের ইতিহাস: ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর শীর্ষ সন্ত্রাসী দমনে কিছুটা প্রশংসা পেলেও, দ্রুতই এটি রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

র‍্যাবের যে কালো ইতিহাস সংস্কারে বাধ্য করল: গুম সংক্রান্ত কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে মোট গুমের ২৫ শতাংশই ঘটিয়েছে র‍্যাব। সন্ধান মেলা ৪০টি গোপন বন্দিশালার (আয়নাঘর) অর্ধেকেরও বেশি (২২-২৩টি) ছিল এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।

ক্রসফায়ারের তাণ্ডব: গত সাত বছরে ১,০০৭টি ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনায় নিহত ১,২৯৩ জনের মধ্যে সরাসরি ২৯৩টি ঘটনাই র‍্যাবের হাতে।

বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব ও এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে মারাত্মক ভাবমূর্তি সংকটে ফেলে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ডিসেম্বরে প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছিল র‍্যাব। কিন্তু কেবল ক্ষমাই যথেষ্ঠ ছিল না—মানবাধিকার রক্ষা ও আইনি সংস্কার নিশ্চিত করতে সংস্থাটির পুনর্গঠন ও নাম বদলই এখন চূড়ান্ত বাস্তবায়নের দিকে।

জনপ্রশাসন/কেএ/২০ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *