এক টুকরো রঙিন কাঠের গাড়ি, কাপড়ের পুতুল কিংবা প্লাস্টিকের জ্যামিতিক ব্লক-শিশুর কচি হাতের এই খেলাগুলো কেবল কাটানো কিছু সময়ের বিনোদন নয়; এর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে তার ভবিষ্যৎ কল্পনার উর্বরতা, বুদ্ধির বিকাশ ও শেখার প্রাথমিক ধাপ। কিন্তু এই নিষ্পাপ আনন্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে নিঃশব্দ বিষের ছোবল। তবে বৈশ্বিক খেলনা শিল্পে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। শুধু রঙিন ও কমদামী খেলনা নয়, বিশ্বজুড়ে অভিভাবক ও গবেষকদের অগ্রাধিকার এখন ‘বিষমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব খেলনা’।
স্থানীয় বাজারের বিশাল চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন এক বৈশ্বিক বাণিজ্যের দুয়ার।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অনিরাপদ খেলনার মূল ঝুঁকি হলো এর বিষক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। চটকদার রঙের আড়ালে ব্যবহৃত ভারী ধাতু ও রাসায়নিকগুলো শিশুদের শরীরে জমে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে। শিশুদের খেলনা চিবানো বা মুখে দেওয়ার অভ্যাসের কারণে এসব ভারী ধাতু রক্তে মিশে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের মতে, সামান্য সীসাও শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ও স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মনোযোগের ঘাটতি ও আচরণগত সমস্যা তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারে কিডনি, হাড় ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। প্লাস্টিক নরম করার এই উপাদানটি শিশুর শরীরে প্রবেশ করে হরমোনের স্বাভাবিক ক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
এক আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান: ২০২৪ সালের ইএসডিও (ESDO)-র এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বাজারে মিলতে থাকা ১৫০টি শিশু পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশেই ক্ষতিকর ভারী ধাতু রয়েছে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৮৮ শতাংশ অভিভাবকই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অসচেতন।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী খেলনার বাজার প্রায় ১২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা চীনের বিষাক্ত খেলনা প্রত্যাহারের ঘটনা বিশ্ব বাজারকে আরও কঠোর সুরক্ষা কাঠামোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে খেলনার বাজারের আকার প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা। মোট চাহিদার প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার খেলনা দেশেই তৈরি হয়, আর বাকি ৩,০০০ কোটি টাকার খেলনা আমদানি করতে হয়। ইতোমধ্যে দেশীয় শতাধিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের তৈরি খেলনা ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যসহ ৪৭টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে পারলে এই বাজার আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।
বিগত সময়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক নীতিমালা না থাকায় বাজারে নিম্নমানের বিষাক্ত খেলনার সয়লাব ছিল। তবে সরকার বর্তমানে শিশুদের সুরক্ষায় যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে:
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)-এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত নিরাপত্তা পরীক্ষা ও বিডিএস মান পূরণ করা ছাড়া কোনো খেলনা উৎপাদন, আমদানি বা বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বিশ্ববাজারে পণ্য পাঠাতে হলে শুধু বিএসটিআই নয়, আন্তর্জাতিক পরীক্ষাগারের ছাড়পত্র ও নিরাপত্তা সনদ পাওয়া এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং ব্যবসার প্রাথমিক শর্ত।
প্লাস্টিকের ভিড়ে বর্তমানে বাঁশ, কাঠ, তুলা ও ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক উপকরণের তৈরি শিক্ষামূলক ও মন্টেসরি (Montessori) খেলনার চাহিদা বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত বাড়ছে। ‘লাইট অব হোপ’-এর টয় ব্র্যান্ড ‘গুফি’ বাঁশ, কাঠ ও কাপড়ের রাসায়নিকমুক্ত ১৫টিরও বেশি উপহার ও শিক্ষামূলক খেলনা তৈরি করে নজর কেড়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাকৃতিক উপাদানের খেলনা তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় কারিগর ও নারীদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, যা কর্মসংস্থান ও নারী ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাজারে একটি সুপরিচিত ‘সেফ টয় হাব’ হিসেবে তুলে ধরতে বিশেষজ্ঞ ও শিল্প উদ্যোক্তারা কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন সেগুলো হচ্ছে দেশেই যেন আধুনিক পরীক্ষাগারের মাধ্যমে দ্রুত ও কম খরচে বিষাক্ত উপাদান পরীক্ষা করা যায়, তার ব্যবস্থা করা। নিরাপত্তা মান মেনে চলতে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ কর-সুবিধা দেওয়া। আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের “নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব খেলনা” বৈশ্বিক ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরা।
শিশুর শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব। কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একদিকে যেমন আমাদের আগামী প্রজন্ম সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি পোশাক শিল্পের মতোই ‘বিষমুক্ত খেলনা শিল্প’ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার-এর মাধ্যমেই শিশুর খেলনা শিল্পে আসবে বৈশ্বিক জয়যাত্রা।
জনপ্রশাসন/কেএ/২০ জুলাই ২০২৬
