মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার আগুন, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত, কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং ইরানের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে তেলের বাজারে যে আগুন লেগেছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শীর্ষ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীনে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে চীন তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ১২ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০.১৯ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার বেশ কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষায় রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি সীমিত করায় এমনিতেই জ্বালানির বাজার উত্তপ্ত ছিল। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় সরবরাহ সংকটের চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) থেকে অতিরিক্ত তেল বাজারে ছাড়তে বাধ্য হলেও দেশটির তেলের মজুত কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১৯ মিলিয়ন ব্যারেলে, যা গত ৪৩ বছরের (১৯৮৩ সালের পর) মধ্যে সর্বনিম্ন।

চীনের পদক্ষেপ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে সম্ভাব্য ধসবিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন অভ্যন্তরীণ বাজারে খুচরা পেট্রলের দাম প্রতি টনে ৩০০ ইউয়ান এবং ডিজেলে ২৯০ ইউয়ান বাড়িয়েছে। ফলে পরিবহন ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ে সরাসরি ধাক্কা লেগেছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৩ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু চীনে যদি উৎপাদন ব্যাহত হয়, তার প্রভাব সরাসরি পড়বে বিশ্বজুড়ে। কারণ,
চীনের ধীরগতি মানেই বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা। ফলে চীনের বাণিজ্যক কাঠামোর কারণে বৈশ্বিক এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষকদের মতে, এই সংকট মূলত ৩টি খাতে বাংলাদেশকে চাপে ফেলবে।

১. আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশ প্রতি বছর চীন থেকে প্রায় ১,৮৫৬ কোটি ডলারের পণ্য (প্রধানত শিল্পের কাঁচামাল ও ভারী যন্ত্রপাতি) আমদানি করে। চীনে উৎপাদন খরচ বাড়লে বাংলাদেশেও পণ্য তৈরির খরচ এক লাফেই বেড়ে যাবে।

২. ডলার ও ঋণের চাপ

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে। এতে ডলারের সংকট তীব্র হবে এবং বেসরকারি খাতের জন্য বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

৩. পরিবহন ও জীবনযাত্রার ব্যয়

বাধ্য হয়ে দেশে জ্বালানির দাম আবার সামঞ্জস্য করতে হলে স্থানীয় পরিবহন খরচ বাড়বে, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার স্পর্শ করে এবং উচ্চ সুদের হার বজায় থাকে, তবে আগামী কয়েকটি প্রান্তিকের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি একটি দীর্ঘস্থায়ী মন্দার (Recession) মুখোমুখি হতে পারে।

পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হকের মতে, জ্বালানি হলো বিশ্ব অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ। এই খাতের যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংকট সরবরাহ শৃঙ্খল অচল করে দিয়ে বিশ্বজুড়ে একযোগে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকুচিত করতে পারে।

এই অবস্থায় বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য পরামর্শ হলোদ্রত বিকল্প জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানো। দেশীয় গ্যাসকূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা। বিলাসবহুল পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা ও সহনশীল মাত্রা বজায় রাখা।

বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন মূলত নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নীতি এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে চীন কত দ্রুত তাদের ক্রয়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে তার ওপর।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ২১ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *